লাইফ স্টাইল ডেস্ক
ঢাকা: প্রাত্যহিক জীবনের খুব সাধারণ কিছু কাজ—সকালে দাঁত মাজা, পানি পান করা, বাইরের ধুলোবালি গায়ে মাখা কিংবা গরম চা ও খাবার খাওয়া। এই অতি সাধারণ রুটিনের আড়ালেই আমাদের শরীরে প্রতিনিয়ত ঢুকছে অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিকের কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক। খালি চোখে এদের অস্তিত্ব বোঝা না গেলেও বিজ্ঞানীরা মানুষের রক্ত, ফুসফুস, যকৃৎ, মস্তিষ্ক এমনকি প্লাসেন্টাতেও এই ক্ষতিকর কণার সন্ধান পেয়েছেন, যা বিশ্বজুড়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া বেশ কিছু টুথপেস্টে এই বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি ধরা পড়ায় বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। তবে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, কেবল টুথপেস্ট নয়; আমাদের নিত্যদিনের খাবার, পানীয়, বাতাস, প্রসাধনসামগ্রী থেকে শুরু করে পরনের পোশাকের মাধ্যমেও এই ‘অদৃশ্য দূষক’ নীরবে শরীরে প্রবেশ করছে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক কী ও কীভাবে তৈরি হয়? মূলত ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট আকারের প্লাস্টিক কণাকেই মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। এটি সাধারণত দুইভাবে তৈরি হয়। প্রথমত, কারখানায় সরাসরি ক্ষুদ্র আকারেই এগুলো তৈরি করা হয় (যা মূলত প্রসাধনী বা নির্দিষ্ট শিল্পপণ্যে ব্যবহৃত হয়)। দ্বিতীয়ত, পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের মোড়ক, গাড়ির টায়ার বা সিনথেটিক কাপড়ের মতো জিনিসপত্র দীর্ঘদিন রোদে পুড়ে বা ঘর্ষণের ফলে ভেঙে সূক্ষ্ম কণায় রূপ নেয়। একবার প্রকৃতিতে মিশে গেলে এগুলো সহজে নষ্ট হয় না বরং বছরের পর বছর মাটি ও পানিতে থেকে ধীরে ধীরে তা আমাদের খাদ্যচক্রের অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
শরীরে প্রবেশের মাধ্যম মানবদেহে এই ক্ষুদ্র কণাগুলোর প্রবেশের প্রধান মাধ্যম তিনটি—খাদ্য, পানি ও শ্বাস-প্রশ্বাস। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সামুদ্রিক মাছ, চিংড়ি, লবণ, বোতলজাত বা কলের পানি, টি-ব্যাগ এমনকি প্রসাধনীতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকে। এছাড়া বাতাসে ভাসমান সূক্ষ্ম কণা শ্বাস নেওয়ার সময় সরাসরি ফুসফুসে চলে যায়। প্লাস্টিকের পাত্রে গরম খাবার রাখা বা বোতলে দীর্ঘদিন পানি সংরক্ষণ করলেও সেখান থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক গলে খাবারে মিশে শরীরে ঢোকে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও উদ্বেগ আগে এটিকে কেবল পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ভাবা হলেও, সাম্প্রতিক গবেষণায় মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গে এর উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার পর এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কণাগুলোর সঙ্গে নানা ক্ষতিকর রাসায়নিক শরীরে ঢুকে হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে কোষে প্রদাহ, প্রজনন সমস্যা, হৃদ্রোগ এবং পেটের উপকারী জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক এবং আগে থেকেই দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা এই দূষণের সবচেয়ে বড় শিকার হতে পারেন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
বাংলাদেশে কেন নতুন করে আলোচনা? বাংলাদেশে যত্রতত্র প্লাস্টিক দূষণ পুরনো সমস্যা হলেও টুথপেস্ট বিতর্কের পর এটি নতুন করে সামনে এসেছে। একবার ব্যবহারযোগ্য পলিথিন, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং খাল-বিল ও নদীতে দূষণের কারণে জলজ প্রাণীর শরীরে প্লাস্টিক ঢুকছে, যা পরে মাছের মাধ্যমে সরাসরি মানুষের প্লেটে উঠে আসছে।
কীভাবে ঝুঁকি কমাবেন? বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চারপাশের পরিবেশ যে পর্যায়ে দূষিত হয়েছে, তাতে মাইক্রোপ্লাস্টিক থেকে শতভাগ মুক্ত থাকা প্রায় অসম্ভব। তবে জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন এনে এর মাত্রা অনেকটাই কমানো যায়:
প্লাস্টিকের বদলে কাচ বা স্টেইনলেস স্টিলের পানির বোতল ও খাবারের পাত্র ব্যবহার করা।
প্লাস্টিকের বাটিতে গরম খাবার না রাখা বা মাইক্রোওয়েভে গরম না করা।
একবার ব্যবহারযোগ্য (সিঙ্গেল ইউজ) পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার বর্জন করা।
ঘরের ধুলোবালি নিয়মিত পরিষ্কার রাখা।
সিনথেটিকের বদলে সুতি বা প্রাকৃতিক তন্তুর তৈরি পোশাক পরার অভ্যাস করা।
টুথপেস্ট ও প্রসাধনী কেনার আগে মোড়কের উপাদান যাচাই করা।
এই সংকট শুধু ব্যক্তিপর্যায়ে সচেতনতা দিয়ে পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন প্লাস্টিক উৎপাদনে সরকারি কঠোর নীতিমালা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এবং দেশীয় পর্যায়ে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে আরও নিবিড় বৈজ্ঞানিক গবেষণা। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই ‘অদৃশ্য ঘাতক’ আগামী দিনে এক ভয়াবহ স্বাস্থ্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
বাংলাফ্লো/এম এইচ এইচ












