বাংলাফ্লো ডেস্ক
ঢাকা: ২০১৪ সালে গভীর থেকে ওঠা অতিরিক্ত গ্যাসের চাপ থামিয়ে দিয়েছিল পাবনার সুজানগরের মোবারকপুরে গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি না থাকায় সাড়ে চার কিলোমিটার গভীরে গিয়েই থেমে যায় খননকাজ। এক দশক পর সেই মোবারকপুরেই আবারও শুরু হয়েছে গ্যাসের সন্ধান। এবার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক কারিগরি সক্ষমতা ও চীনা প্রযুক্তি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) নতুন উদ্যোগে ৬ কিলোমিটারের বেশি গভীরে খনন করা হবে মোবারকপুর ডিপ-১ কূপ। ভূগর্ভে গ্যাসের মজুত পাওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কূপটি সফল হলে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব হতে পারে এবং সম্ভাব্য মজুত অনুযায়ী প্রায় ২০ বছর এই কূপ থেকে গ্যাস পাওয়ার প্রত্যাশা করছে বাপেক্স। দেশে যখন গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতি শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকে চাপে ফেলছে, তখন পাবনার এই অনুসন্ধান কূপ ঘিরে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
বাপেক্স কর্মকর্তা ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পাবনার সাঁথিয়া ও সুজানগর উপজেলার সীমান্তবর্তী মোবারকপুর এলাকায় কয়েক দশক আগেই প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্ভাবনার কথা উঠে আসে। ১৯৮০-৮১ সালে পেট্রোবাংলা প্রথম সেখানে জরিপ চালায়। এরপর ১৯৮৩-৮৪ সালে একটি জার্মান প্রতিষ্ঠান এবং ২০০৬ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে বাপেক্স আরও কয়েক দফা ভূতাত্ত্বিক জরিপ করে। এসব জরিপে এলাকায় গ্যাসের সম্ভাবনার তথ্য পাওয়ার পর ২০১৪ সালে প্রায় ৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে মোবারকপুরে অনুসন্ধান কূপ খননের উদ্যোগ নেয় বাপেক্স। সাড়ে চার কিলোমিটার গভীরে যাওয়ার পর ভূগর্ভের অতিরিক্ত গ্যাসের চাপের মুখে পড়ে খননকাজ। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও কারিগরি সক্ষমতার অভাবে শেষ পর্যন্ত কাজ স্থগিত করতে হয়।
সেই ব্যর্থতার পরও সম্ভাবনার জায়গাটি পুরোপুরি বাদ দেয়নি বাপেক্স। নতুন প্রযুক্তির সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে এবার আবারও সেখানে অনুসন্ধানে নেমেছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশনস অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, “২০১৪ সালে নির্দিষ্ট গভীরতায় যাওয়ার পর ভূগর্ভের তীব্র চাপের কারণে খননকাজ বন্ধ রাখতে হয়েছিল। সেই চাপ মোকাবিলা করে আরও গভীরে যাওয়ার মতো প্রযুক্তি তখন দেশের হাতে ছিল না। তবে এবার উন্নত আন্তর্জাতিক কারিগরি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রথম দফায় সফলতা না এলেও এবার আশানুরূপ ফল পাওয়ার এবং গ্যাস উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে।”
জানা গেছে, দেশের তিনটি সম্ভাবনাময় এলাকায় গভীর অনুসন্ধান কূপ খননের জন্য ১ হাজার ১৩৬ কোটি ২৫ লাখ টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এর আওতায় পাবনার মোবারকপুর ডিপ-১, কুমিল্লার শ্রীকাইল ডিপ-১ এবং সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ সাউথ-১ কূপ খনন করা হবে। মোবারকপুর ডিপ-১ কূপের আগের অনুসন্ধানস্থল ও পরিত্যক্ত কূপ থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে নতুন করে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। ভূগর্ভের উচ্চ চাপ মোকাবিলা করে এত গভীরে খননের জন্য আন্তর্জাতিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘সিএনপিসি চুয়ানচিং ড্রিলিং ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড’র (সিসিডিসি) সঙ্গে চুক্তি করেছে বাপেক্স।
শুধু গ্যাস উত্তোলন নয়, মোবারকপুরের সম্ভাব্য সাফল্যকে উত্তরাঞ্চলের শিল্পায়নের সঙ্গেও দেখছেন স্থানীয়রা। সুজানগরের সরকারি ডা. জহুরুল কামাল ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আব্দুল মজিদ বলেন, “কূপটি সফল হলে শুধু এ অঞ্চল নয়, পুরো উত্তরবঙ্গের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে। স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।”
পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম জানান, চলতি বছরের মার্চে ওই এলাকার ছয় একর জমি হুকুম দখল করে আনুষ্ঠানিকভাবে বাপেক্সের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজ চলছে। গ্যাস কূপ খনন সফল হলে নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে ওঠার এবং বড় পরিসরে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
বাপেক্সের উপ-সহকারী প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম জানান, গত ২৭ জুলাই থেকে প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্প এলাকায় ভূমি উন্নয়ন, পাইলিং ও নিরাপত্তাদেয়াল নির্মাণের কাজ চলছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এসব কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর চীনা প্রতিষ্ঠানটি কূপ খননের কাজ শুরু করবে।
মোবারকপুর ডিপ-১ প্রকল্পের পরিচালক ও বাপেক্সের উপমহাব্যবস্থাপক (অপারেশনস) এস এ এম মেরাজুল আলম জানান, সব প্রস্তুতি শেষ করে ২০২৮ সালের জুনের মাঝামাঝি সময়ে কূপটির মূল ড্রিলিং শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০২৮ সালের শেষ দিকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু করা সম্ভব হতে পারে।
বাংলাফ্লো/এম এইচ এইচ












