আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ঢাকা: ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজনীতিতে বড় ধরনের ভূমিকম্প। বিধানসভা নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠনের এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ভেঙে তিন টুকরো হয়ে গেছে তৃণমূল কংগ্রেস। সদ্য-বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে দলের রাশ এরই মধ্যে প্রায় ফসকে গেছে। এখন মানুষের মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তৃণমূলের দলীয় প্রতীক ও বিপুল পরিমাণ সম্পত্তিও কি তাদের হাতছাড়া হতে চলেছে?
কীভাবে তিন ভাগ হলো তৃণমূল? দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন চরম পর্যায়ে। একদিকে, বিধানসভার ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৬০ জনই মমতার সঙ্গ ছেড়ে বিদ্রোহী হয়েছেন। তারা বিদ্রোহী দলনেতা ঋতব্রত ব্যানার্জিকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঘোষণার পক্ষে স্বাক্ষর করেছেন।
অন্যদিকে, লোকসভায় তৃণমূলের ৪১ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ২০ জন সরাসরি বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটকে সমর্থনের ঘোষণা দিয়েছেন। সোমবার দিল্লিতে বিজেপির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব এবং পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বাধীন একগুচ্ছ বিদ্রোহী সংসদ সদস্য।
বিদ্রোহী বিধায়ক নেতা ঋতব্রত ব্যানার্জি অবশ্য জানিয়েছেন, সংসদীয় দলের এই পদক্ষেপের সঙ্গে তাদের রাজ্য ব্লকের কোনো সম্পর্ক নেই এবং তারা আদর্শগতভাবে এখনো বিজেপি-বিরোধী। ফলে তর্কের খাতিরে এই দুই ব্লককে আলাদা ধরলে তৃণমূল কংগ্রেস এখন কার্যত তিন ভাগে বিভক্ত।
দলের প্রতীক ও সম্পত্তির অধিকার কার? তৃণমূলের এই ভাঙনের পর মহারাষ্ট্রের শিবসেনা বা এনসিপির মতো প্রতীক হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে ভারতের নির্বাচন কমিশনের ‘সিম্বলস অর্ডার ১৯৬৮’-এর ১৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, দলের প্রতীকের যৌক্তিক দাবিদার বেছে নেওয়ার ক্ষমতা কমিশনের রয়েছে। মূলত ১৯৭১ সালের ‘সাদিক আলি বনাম ভারতের নির্বাচন কমিশন’ মামলার রায়ের ওপর ভিত্তি করে কমিশন নিচের বিষয়গুলো বিবেচনা করে:
এমপি, এমএলএ ও দলীয় সংগঠনের সিংহভাগ নেতা কোন পক্ষে রয়েছেন।
কোন অংশ দলের সংবিধানের প্রতি বেশি আনুগত্য প্রদর্শন করছে।
দলের উদ্দেশ্য ও পন্থার সঙ্গে কোন অংশের মতামত বেশি মিলছে।
নির্বাচন কমিশনের সাবেক কমিশনার অশোক লাভাসার মতে, দলের ভেতর থেকে কেউ ‘ডিসপিউট’ বা বিবাদের দাবি নিয়ে দ্বারস্থ হলেই কেবল কমিশন তা খতিয়ে দেখে। তবে প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত তৃণমূলের কোনো পক্ষই নিজেদের আসল তৃণমূল বলে দাবি করে নির্বাচন কমিশনে যায়নি।
সম্পত্তি হারানোর শঙ্কা ২০২৪-২০২৫ সালের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, আয়ের নিরিখে বিজেপির পরেই ভারতের সবচেয়ে সম্পদশালী রাজনৈতিক দল তৃণমূল কংগ্রেস। তাদের মোট সম্পত্তির পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে রয়েছে:
স্থাবর সম্পত্তি: ৭ কোটি টাকা
বিনিয়োগ: ২৫০.৮ কোটি টাকা
ব্যাংকে নগদ অর্থ: ৬৮১.১ কোটি টাকা
আইন অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনে যদি মমতা-বিরোধী কোনো ব্লক সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে পারে, তবে শুধু প্রতীকই নয়, তৃণমূল কংগ্রেসের এই বিপুল পরিমাণ সম্পদও মমতার হাতছাড়া হয়ে যাবে।
ভারতের ইতিহাসে অন্যান্য দলে ভাঙন
শিবসেনা ও এনসিপি: সম্প্রতি মহারাষ্ট্রে উদ্ধব ঠাকরের হাত থেকে শিবসেনার রাশ ও প্রতীক ছিনিয়ে নেন একনাথ শিন্ডে। একইভাবে শরদ পাওয়ারের দল এনসিপি ভেঙে দলীয় প্রতীক নিজেদের কবজায় নেন তার ভাতিজা অজিত পাওয়ার (গত ২৮ জানুয়ারি বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি উপ-মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন)।
এআইএডিএমকে: ১৯৮৭ সালে এম জি রামচন্দ্রনের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী জানকী এবং দলের নেত্রী জে জয়ললিতার মধ্যে বিভাজন তৈরি হয়েছিল, যা পরে জয়ললিতার নেতৃত্বেই পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হয়।
কংগ্রেস: ১৯৬৯ সালে ইন্দিরা গান্ধীকে বহিষ্কার করা হলে তিনি ‘নব্য কংগ্রেস’ গঠন করেন এবং পরে মূল কংগ্রেসের উত্তরাধিকার লাভ করেন। প্রথমে ‘গাই ও বলদ’ প্রতীকে লড়লেও পরে তিনি ‘হাত’ প্রতীক বেছে নেন।
বাংলাফ্লো/এফআইআর



