বাংলাফ্লো ডেস্ক
ঢাকা: বাংলাদেশকে ব-দ্বীপ এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রতিনিয়ত বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হয়। নিম্নচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে অব্যাহত ভারী বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি দিন দিন জটিল রূপ ধারণ করছে। তবে এই অবস্থার জন্য প্রকৃতির পাশাপাশি মানবসৃষ্ট দায়ও কম নয়।
বর্তমান বন্যা এবং তীব্র জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান মানবসৃষ্ট কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ণ। সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তর, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে সারা দেশে প্রায় ১০ হাজার একর জমি অবৈধভাবে দখল করে রাখা হয়েছে। বৈধ অনুমোদন ছাড়াই গড়ে উঠেছে প্রায় ১,৫০০ বেসরকারি আবাসন প্রকল্প। নিয়মনীতি না মেনে জলাশয় ভরাট করায় বর্ষার পানি প্রাকৃতিকভাবে নদীতে নেমে যাওয়ার কোনো পথ পাচ্ছে না। নদী-খাল অবমুক্ত করে এসব বেআইনি আবাসন বন্ধ করা না গেলে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের (FFWC) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চট্টগ্রাম, বান্দরবান, কক্সবাজার, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলা বন্যাকবলিত। চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে উপকূলীয় বেড়িবাঁধের একটি বড় অংশ অরক্ষিত থাকায় এবং সাম্প্রতিক বন্যায় বাঁধ ভেঙে সাগরের নোনা পানি লোকালয়ে প্রবেশ করায় অন্তত ২০ হাজার মানুষ চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে বাঁধের তলদেশ দুর্বল হয়ে পড়ায় সামান্য জোয়ারের চাপেই তা ভেঙে গেছে।
জার্মানওয়াচের জলবায়ু ঝুঁকি সূচক অনুযায়ী, চরম বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। এছাড়া সাম্প্রতিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে প্রতি বছর গড়ে ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ক্ষতি হচ্ছে, যা জাতীয় প্রবৃদ্ধির ওপর সরাসরি বড় একটি ধাক্কা।
দেশের হাওর ও উপকূলীয় এলাকায় ‘জরুরি সংস্কারের’ নামে প্রতি বছর বর্ষার ঠিক আগমুহূর্তে তড়িঘড়ি করে বাঁধের কাজ শুরু করা হয়, যাতে বন্যার স্রোতে কাজ ভেসে গেলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের দোহাই দিয়ে দুর্নীতির হিসাব ধামাচাপা দেওয়া যায়। ঢাকা ও লন্ডনের (SOAS) যৌথ গবেষকদের একটি সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, বাংলাদেশে গত দেড় দশকে বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর মোট বাজেটের প্রায় ৩৫ শতাংশ অর্থ দুর্নীতি ও অদক্ষতার কারণে লোপাট হয়েছে। টিআইবি-এর গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড (BCCTF) এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপকূলীয় সুরক্ষা প্রকল্পগুলোর ৫০ শতাংশেরও বেশি অর্থ অনিয়ম ও আত্মসাতের কারণে নষ্ট হয়েছে।
টেকসই বাঁধ নির্মাণ কেবল একটি প্রকৌশলগত সমস্যা নয়, এটি মূলত সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও সুশাসনের সংকট। প্রিন্সিপাল-এজেন্ট সমস্যা ও ‘রেন্ট-সিকিং’ মানসিকতার কারণে ঠিকাদাররা প্রকৃত বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যে বাজেট পাস করিয়ে নেয় এবং নিম্নমানের কাজ করে পুরো বিল তুলে নেয়।
শুধু মাটির উঁচু বাঁধ দিয়ে বা জোড়াতালির জিও-ব্যাগ ফেলে এই স্থায়ী সংকট সমাধান সম্ভব নয়। বাঁধ তৈরিতে ব্যবহৃত সিসি ব্লক ও প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার গুণগত মান বুয়েট বা সমমানের তৃতীয় কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরীক্ষা করাতে হবে। নদীর নাব্যতা বাড়াতে ক্যাপিটাল ড্রেজিং করতে হবে এবং ছড়া বা খালগুলো দখলমুক্ত করতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগ, জবাবদিহিতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া মানবসৃষ্ট এই দুর্যোগ মোকাবিলা সম্ভব নয়। পরিবেশকে তার নিজস্ব রূপ ফিরিয়ে দেওয়াই হবে এই সংকটের সবচেয়ে স্থায়ী সমাধান।
(লেখক: সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়)
বাংলাফ্লো/এফআইআর












