বাংলাফ্লো ডেস্ক
ঢাকা: কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের জেরে দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। গত ২১ জুলাই এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে। বর্তমানে মেরামতের কাজ শুরু হলেও চলতি মাসে কার্যক্রম পুনরায় শুরু হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
দেশে আমদানিকৃত এলএনজি পুনঃবাষ্পীভবন (রিগ্যাসিফিকেশন) করে পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য দুটি ভাসমান টার্মিনাল (ফ্লোটিং স্টোরেজ রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট বা এফএসআরইউ) রয়েছে। এই দুটি টার্মিনালের সম্মিলিত সরবরাহ সক্ষমতা ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু অগ্নিকাণ্ডের পর একটি টার্মিনালের গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই দেশব্যাপী তীব্র গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, টার্মিনালের বয়লার থেকে বের হওয়া সিগন্যালবাহী বৈদ্যুতিক তারে শর্টসার্কিট থেকে এই অগ্নিকাণ্ড ঘটে। বর্তমানে বিদেশি প্রকৌশলীরা এটি মেরামতে কাজ শুরু করেছেন। তবে চলতি সপ্তাহে টার্মিনালটি স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই।
বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট, যার বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ কমেছে প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট, ফলে মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুটে। দৈনিক চাহিদার বিপরীতে আগে ৩০ শতাংশ গ্যাস কম সরবরাহ করা হতো, এখন সেই ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশে।
“একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় গ্যাসের এ সংকট তৈরি হয়েছে মেরামতের কাজ চলমান রয়েছে। তবে, এ মাসের মধ্যে তা ঠিক হবে না, আরও কিছুদিন সময় লাগবে।” — মো. রফিকুল ইসলাম, পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস), পেট্রোবাংলা।
আবাসিকে চরম ভোগান্তি
গ্যাস সংকটের ফলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন আবাসিকের গ্রাহকেরা। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চুলায় গ্যাস থাকছে না। ফলে রান্নাবান্নাসহ আনুষঙ্গিক কাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
রাজধানীর মগবাজারের বাসিন্দা গৃহিণী পারভীন বলেন, “সারাদিনেই চুলায় কোনো গ্যাস থাকে না। উপায় না পেয়ে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। আর যদি রাতে গ্যাস আসে, তখন রান্নার কাজ সারতে হচ্ছে।” মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মো. সুমন জানান, চুলায় গ্যাসের চাপ এতই কম যে রান্না বসালে তা এক ঘণ্টাতেও শেষ হচ্ছে না।
চুলার গ্যাসের বিকল্প হিসেবে বাধ্য হয়ে সিলিন্ডার ও ইনডাকশন চুলার দিকে ঝুঁকছেন গ্রাহকরা। এতে আবাসিকের নির্ধারিত বিল মেটানোর পাশাপাশি বিকল্প ব্যবস্থার কারণে দ্বিগুণ খরচ গুনতে হচ্ছে তাদের।
এ প্রসঙ্গে তিতাস গ্যাসের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান জানান, তিতাসের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা রয়েছে ১৯০ কোটি ঘনফুটের মতো। এলএনজির সরবরাহ কমে যাওয়ায় তা ১২০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। টার্মিনাল ঠিক না হওয়া পর্যন্ত এই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়।
সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সারি
সিএনজি স্টেশনগুলোতেও গ্যাসের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। রাজধানীর প্রায় প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের চাপ কম থাকায় গ্যাস নিতে আসা যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে।
মগবাজারের আনুদীপ সিএনজি স্টেশনে অপেক্ষারত চালক মো. আল আমিন বলেন, “যে স্টেশনেই যাচ্ছি, সেখানেই বলা হচ্ছে গ্যাস নেই। এখানে গ্যাস থাকলেও চাপ কম। সবাই চাহিদামতো পাচ্ছে না।” আরেক চালক মো. কাউছার জানান, ট্রিপের জন্য পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় ট্রিপ কমাতে হচ্ছে, যার ফলে তাদের দৈনন্দিন উপার্জনও কমে যাচ্ছে।
দেশীয় গ্যাস উত্তোলনে জোর দেওয়ার তাগিদ
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানি করা জ্বালানির ওপর অতি-নির্ভরতাই বর্তমান সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে। এ সংকট কাটাতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জোর দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
“আমরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছি জ্বালানির সংকট কাটাতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের দেশে গ্যাসের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু তা উত্তোলনে মনোযোগ না দিয়ে আমদানিতেই জোর দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সরকার নতুন কূপ খননে উদ্যোগ নিয়েছে, তবে তা আরও আগেই গ্রহণ করা দরকার ছিল। তাতে করে এ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হতো।” — ইজাজ হোসেইন, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ।
বাংলাফ্লো/এম এইচ এইচ












