বাংলাফ্লো ডেস্ক
ঢাকা: আজ বুধবার (২৯ জুলাই) বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস। দিবসটি ঘিরে বন বিভাগ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণ কেবল একটি বিপন্ন প্রাণী রক্ষা নয়, বরং পুরো ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র, জীববৈচিত্র্য ও উপকূলীয় পরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বন বিভাগের তথ্যমতে, সংরক্ষণ কার্যক্রমের ইতিবাচক ফলের কারণে সুন্দরবনে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০১৪ সালে বাঘের সংখ্যা ছিল ১০৬টি এবং ২০১৮ সালে ১১৪টি। ২০২৪ সালের সর্বশেষ শুমারিতে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৫টিতে। কঠোর আইন প্রয়োগ, স্মার্ট পেট্রোলিং, ক্যামেরা ট্র্যাপ, ড্রোন নজরদারি এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের ফলে বাঘ হত্যা ও মানুষ-বাঘের সংঘাত উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
তবে স্বস্তির পাশাপাশি শঙ্কাও রয়েছে। চোরা শিকার, পাচার, জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন এবং আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার মতো নানাবিধ হুমকি এখনো সুন্দরবনের বাঘের অস্তিত্বের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ।
আড়াই দশকের খতিয়ান ও বর্তমান উন্নতি বন বিভাগের গত আড়াই দশকের তথ্যানুযায়ী, পূর্ব সুন্দরবনে অন্তত ৯১টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চোরা শিকারি ও পাচারকারীদের হাতে ২৬টি, বনদস্যুদের হাতে ১৮টি, গ্রামবাসীর পিটুনিতে ১৪টি, বার্ধক্যে ২১টি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ৩টি বাঘ মারা যায়। একই সময়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪২৫ জন বনজীবী। তবে স্মার্ট পেট্রোলিং ও নজরদারির কারণে বর্তমানে পরিস্থিতির অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে। ফলস্বরূপ ২০২৪ সালের পর থেকে সুন্দরবনে কোনো বাঘ হত্যা বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
এমনকি বাঘ সংরক্ষণের সফল উদাহরণও তৈরি করেছে বন বিভাগ। চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জে শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকে পড়া একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘিনীকে উদ্ধার করে ছয় মাস চিকিৎসা দেওয়া হয়। সুস্থ হওয়ার পর গত ১২ জুলাই সেটিকে ফের সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়েছে। বাঘিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণে বনাঞ্চলের আট কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ২০টি স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা বসানো হয়েছে।
বাঘের অবাধ বিচরণ বিশ্ব বাঘ দিবসের প্রাক্কালে মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে পূর্ব সুন্দরবনে দুই দফা বাঘের দেখা মিলেছে। গত ২৪ জুলাই চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক বন অফিসের সামনে খোলা জায়গায় একটি বাঘিনী অবস্থান করে। এরপর ২৬ জুলাই সকালে শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী টাইগার পয়েন্ট এলাকায় নদী সাঁতরাতে দেখা যায় একটি বাঘকে।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, “সরকার সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। স্মার্ট পেট্রোলিং ও নজরদারির কারণে সম্প্রতি বাঘের চলাচল বেড়েছে। আট কিলোমিটার এলাকাজুড়ে স্থাপন করা ক্যামেরা ট্র্যাপে নতুন তিনটি বাঘের ছবি ধরা পড়েছে। বর্তমানে সুন্দরবনে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকায় বন মানব কোলাহলমুক্ত, তাই বন্যপ্রাণীরা অবাধে বিচরণ করছে।”
বিশেষজ্ঞদের তাগিদ পরিবেশ সংগঠন ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’-এর প্রধান সমন্বয়কারী ড. নূর আলম শেখ বলেন, “বাঘ বাঁচলে সুন্দরবন বাঁচবে, আর সুন্দরবন বাঁচলে উপকূলও নিরাপদ থাকবে। বন বিভাগ, স্থানীয় জনগণ ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ আরও শক্তিশালী করতে হবে।”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বাঘ বিশেষজ্ঞ ড. এম. এ. আজিজ বলেন, “শুধু আইন করলেই হবে না, বাঘ রক্ষা করতে হলে আগে বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণ রক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাঘের আবাসস্থল রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।”
বাংলাফ্লো/এম এইচ এইচ












