জেলা প্রতিনিধি
খুলনা: খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের প্রধান অধ্যাপক মো. রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে নিজ ছাত্রীদের যৌন হয়রানি, অশালীন আচরণ এবং অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এক ভুক্তভোগী ছাত্রীর লিখিত অভিযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আপত্তিকর মেসেজের স্ক্রিনশট দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অভিযুক্ত শিক্ষককে ডিসিপ্লিন প্রধানের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
ভয়ংকর সব মেসেজ ও ভুক্তভোগীদের বয়ান গত মঙ্গলবার (১৬ জুন) ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থীর পক্ষে অন্য শিক্ষার্থীরা প্রমাণাদিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ কেন্দ্রে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। নথিপত্রে দেখা যায়, অভিযুক্ত শিক্ষক মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপে ছাত্রীদের উদ্দেশে চরম কুরুচিপূর্ণ বার্তা পাঠাতেন। এর মধ্যে রয়েছে— “তোমার মতো মেয়ে বিয়ের আগে পাওয়া দরকার ছিল”, “বন্ধু হবা, কফি খাব আর মজা করব”, “বন্ধুর সঙ্গে হাগ করলে ডিপ্রেশন থাকে না”, “আই লাভ ইউ মোর দ্যান আই ক্যান সে” এবং “আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না” ইত্যাদি।

ভুক্তভোগী ওই ছাত্রী জানান, ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করার পর থেকেই অভিযুক্ত শিক্ষক তাকে এমন অস্বস্তিকর মেসেজ পাঠাতে শুরু করেন। একপর্যায়ে অতিষ্ঠ হয়ে তিনি বিষয়টি সহপাঠীদের জানান। তিনি বলেন, “শুরুতে এই প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে মুখ খুলতে ভয় পেলেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা প্রয়োজন মনে করেই সামনে এসেছি। আমি চাই অন্যরাও সাহস করে কথা বলুক এবং এর দৃষ্টান্তমূলক বিচার হোক।”

এদিকে, এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর একই ডিসিপ্লিনের সাবেক ও বর্তমান আরও বেশ কয়েকজন ছাত্রী মুখ খুলেছেন। তারা জানান, প্রায় এক যুগ আগে থেকেই তিনি ক্লাসে কিংবা গভীর রাতে ফোন করে ছাত্রীদের (বিশেষ করে বিবাহিতদের) আপত্তিকর প্রশ্ন করে বিব্রত করতেন। তার কথায় সায় না দিলে ব্যক্তিগত আক্রোশেরও শিকার হতে হতো।

অভিযুক্ত শিক্ষকের দাবি অধ্যাপক মো. রেজাউল ইসলাম তার বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে এগুলোকে ‘ভিত্তিহীন ও ষড়যন্ত্রমূলক’ বলে দাবি করেছেন। তার ভাষ্যমতে, গত ফেব্রুয়ারিতে তার মোবাইল ফোনটি চুরি হয়ে যায়। এরপর তিনি থানায় জিডি করেন এবং নিজের ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলেন। ডিসিপ্লিন প্রধান হিসেবে কড়াকড়ি আরোপ করায় একটি মহল ঈর্ষান্বিত হয়ে তার বিরুদ্ধে এই অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

প্রশাসনের পদক্ষেপ ও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. হারুনর রশিদ খাঁন জানিয়েছেন, ডিনদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক শেষে অভিযুক্ত শিক্ষককে ডিসিপ্লিন প্রধানের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তার বদলে ড. মো. ইয়াসিনকে ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ কেন্দ্রের সভাপতি অধ্যাপক মোছা. তাসলিমা খাতুন জানিয়েছেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বুধবার (১৭ জুন) বিকেলে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরবর্তী আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেবে।
এদিকে, এই ন্যক্কারজনক ঘটনার প্রতিবাদে এবং নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন খুবির সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তারা অবিলম্বে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অভিযুক্ত শিক্ষকের স্থায়ী অপসারণ ও কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
বাংলাফ্লো/এফআইআর



