বাংলাফ্লো ডেস্ক
ঢাকা: দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ব্যবসা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে আসন্ন বাজেটে ‘কিছুটা হলেও’ নতুনত্ব ও সৃজনশীলতার প্রতিফলন দেখতে চান ব্যবসায়ীরা। নতুন সরকারের এই প্রথম বাজেটে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি ছাড়ের আশা না করলেও, তারা করের বোঝা না বাড়িয়ে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যবসাবান্ধব নীতিমালার দিকে জোর দিচ্ছেন। বিশেষ করে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে অনূর্ধ্ব ৩০ বছর বয়সীদের পাঁচ বছরের জন্য করমুক্ত সুবিধা দেওয়ার একটি যুগান্তকারী প্রস্তাব এসেছে ব্যবসায়ী নেতাদের পক্ষ থেকে।
উচ্চাভিলাষী ঘোষণার চেয়ে বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট ও দেশীয় বাস্তবতায় স্থিতিশীল নীতিকেই এখন বেশি জরুরি মনে করছেন শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা। দেশের বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন প্রত্যাশার কথাই জানা গেছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ জানান, বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি বাস্তবমুখী বাজেট প্রয়োজন, যেখানে উচ্চাভিলাষী ঘোষণা নয়, বরং বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, “অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ থাকা দরকার। ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরাতে খেলাপি ঋণ কমানো ও সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি করহার স্থিতিশীল রাখা, ভ্যাট প্রক্রিয়া সহজ করা এবং লজিস্টিক খরচ কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।”
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ জানান, সরকারের বয়স মাত্র তিন মাস হওয়ায় বাজেটে বড় কোনো চমক প্রত্যাশা করা ঠিক হবে না। তবে তিনি নতুন করে করের বোঝা না চাপিয়ে করজাল (Tax Net) সম্প্রসারণের দাবি জানান।
তিনি বলেন, “যারা নিয়মিত কর দিচ্ছেন, তাদের ওপরই বারবার চাপ বাড়ানো হয়। মানুষ চায় জিনিসপত্রের দাম কমুক, আর ব্যবসায়ীরা দেখতে চান ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ কতটা অনুকূলে যাচ্ছে। বিশেষ করে জ্বালানির দাম, উচ্চ সুদহার ও ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার বিষয়টি ব্যবসায়ীদের ভাবাচ্ছে।”
বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) চেয়ারম্যান আবুল কাসেম খান বাজেটে সৃজনশীলতার দাবি জানিয়ে বলেন, “সরকার আগামী ১৮ মাসের মধ্যে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা মূলত বেসরকারি খাতের মাধ্যমেই সম্ভব। তাই আমরা চাই, দেশে এক লাখ নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি করা হোক।”
তিনি প্রস্তাব করেন, “যাদের বয়স ২৮ থেকে ৩০ বছর, এমন নতুন তরুণ উদ্যোক্তাদের আগামী পাঁচ বছরের জন্য করমুক্ত সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। দেশে বেকারত্ব কমাতে উদ্যোক্তা সৃষ্টি একটি বড় বিকল্প। পাশাপাশি আমরা দীর্ঘমেয়াদি নীতি ও করকাঠামো চাই, যাতে ব্যবসায়ীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে।”
বাজেটে দেশের আইসিটি খাতের উন্নয়নে দক্ষ জনসম্পদ তৈরিতে বড় বরাদ্দ রাখার আহ্বান জানিয়েছেন বেসিসের সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর। তিনি বলেন, “আইটি খাতে কর অব্যাহতি বছর বছর না বাড়িয়ে একবারে ২০৩১ সাল পর্যন্ত ৫ বছরের জন্য করা উচিত। এছাড়া ডিজিটাল কমার্সকে উৎসাহিত করতে আগামী ৫ বছরের জন্য ই-কমার্সকে সম্পূর্ণভাবে ভ্যাটের আওতামুক্ত রাখা প্রয়োজন।”
বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সভাপতি মোহা. খোরশেদ আলম দেশীয় শিল্প সুরক্ষার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “পোশাক শিল্পে অন্তত ৫০ শতাংশ স্থানীয় ভ্যালু অ্যাডিশন বাধ্যতামূলক করা উচিত। এছাড়া ইনকাম ট্যাক্স বা ভ্যাটের নামে ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধ করে একটি আস্থাশীল করবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।”
সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক সংকটের মধ্যেও নতুন সরকারের কাছে দেশের ব্যবসায়ী সমাজের প্রত্যাশা অনেক বেশি। তারা এমন একটি বাজেট চান যা কেবল রাজস্ব আদায়ের হাতিয়ার না হয়ে, বরং দেশের শিল্প, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের প্রকৃত ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
বাংলাফ্লো/এফআইআর






