বাংলাফ্লো ডেস্ক
ঢাকা: বিদ্যুৎ খাতে ক্রমবর্ধমান লোকসান ও বিশাল অঙ্কের সরকারি ভর্তুকির লাগাম টানতে পাইকারি ও খুচরা— উভয় পর্যায়েই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বড় প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি। প্রস্তাবনা অনুযায়ী, খুচরা পর্যায়ে আবাসিক গ্রাহকদের ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের গড় দাম ৭ টাকা ২০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ৬৫ পয়সা করার সুপারিশ করা হয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে আজ ও আগামীকাল (২০-২১ মে) জরুরি গণশুনানি আহ্বান করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।
জ্বালানি তেলের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের উচ্চমূল্য এবং রেন্টাল-ক্যাপাসিটি চার্জের বিশাল আর্থিক সংকটকে এই মূল্য সমন্বয়ের প্রধান কারণ হিসেবে দেখিয়েছে বিদ্যুৎ খাতের রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো। তবে এই প্রস্তাব পাস হলে সবচেয়ে বেশি আর্থিক চাপে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির সাধারণ গ্রাহকরা।
খুচরা ও আবাসিক খাতে বড় ধাক্কা: ৫০ ইউনিটের গ্রাহকের বিল হবে দ্বিগুণ
দেশে বর্তমানে মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের সংখ্যা ৪ কোটি ৯৭ লাখ ৮৫ হাজার ২৫৮ জন। এর মধ্যে বিপিডিবির অধীনে থাকা ৪৩ লাখ ৮১ হাজার ৫৮৯ জন গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ৩৮ লাখই আবাসিক গ্রাহক। চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ বিক্রি বাবদ বিপিডিবির ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১১২ কোটি ১০ লাখ টাকা, যা আগামী অর্থবছরে আরও তিন গুণ বেড়ে ৩২৮ কোটি ৯০ লাখ টাকায় পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে বিপিডিবি তাদের নতুন পরিকল্পনায় ০ থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী সমস্ত গ্রাহককে একই স্ল্যাবের আওতায় নিয়ে আসার প্রস্তাব করেছে। এই নতুন স্ল্যাবের জন্য প্রতি ইউনিটের মূল্য ৮ টাকা ৬৫ পয়সা করার সুপারিশ করা হয়েছে। এর ফলে বর্তমানে মাসে মাত্র ৫০ ইউনিট ব্যবহার করা একজন সাধারণ বা নিম্নআয়ের গ্রাহকের (যিনি এখন ইউনিটপ্রতি ৪ টাকা ৬৩ পয়সা বিল দেন) মাসিক বিদ্যুৎ খরচ এক লাফে প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে।
উচ্চমাত্রার বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের জন্য প্রস্তাবিত বিল বৃদ্ধি:
২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট: ২১.৭৪ শতাংশ বৃদ্ধি
৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট: ২২.৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি
৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট: ২৩.২৯ শতাংশ বৃদ্ধি
৬০০ ইউনিটের বেশি (উচ্চবিত্ত): ২৩.৯৫ শতাংশ বৃদ্ধি
পাইকারি দামও ১২ টাকা ৯১ পয়সা করার দাবি বিপিডিবির
বর্তমানে বিদ্যুতের পাইকারি মূল্য প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ৪ পয়সা, যা প্রকৃত উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে অনেক কম। চলতি অর্থবছরে বিপিডিবির মোট ব্যয় ১ লাখ ১২ হাজার০৮৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, যার মধ্যে লোকসানের পরিমাণই ৬০ হাজার ১২৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে সরকার চলতি বছর ৩৮ হাজার০৬৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা ভর্তুকি দিয়েছে।
আগামী অর্থবছরে পাইকারি মূল্য বাড়ানো না হলে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়ে যাবে ৬২ হাজার ৯৬৪ কোটি ৬০ লাখ টাকায়। এই বিপর্যয় এড়াতে আগামী অর্থবছরে ১ লাখ ৪৩ হাজার১০৮ কোটি ৭০ লাখ টাকার সামগ্রিক রাজস্ব চাহিদা বিবেচনা করে বিদ্যুতের পাইকারি মূল্য প্রতি ইউনিট ১২ টাকা ৯১ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছে পিডিবি।
বিতরণ কোম্পানিগুলোর পৃথক প্রস্তাবনা ও লোকসানের চিত্র
বিতরণ কোম্পানির নাম –পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (REB)
গ্রাহক সংখ্যা / এলাকা -৩ কোটি ৮০ লাখ (গ্রামীণ ও প্রান্তিক)
চলতি অর্থবছরের লোকসান -১,৬৯৮ কোটি টাকা
প্রস্তাবিত পরিবর্তন / দাবি – ০-৫০ ইউনিটের লাইফলাইন গ্রাহকদের দাম অপরিবর্তিত থাকবে; তবে গড় বিক্রয়মূল্য ৯ টাকা করার দাবি।
বিতরণ কোম্পানির নাম–ডেসকো (DESCO)
গ্রাহক সংখ্যা / এলাকা -ঢাকা (মিরপুর, উত্তরা, গুলশান)
চলতি অর্থবছরের লোকসান -৫৯৬ কোটি টাকা
প্রস্তাবিত পরিবর্তন / দাবি -খুচরা পর্যায়ে ৯.৬৭% দাম বাড়ানোর আবেদন ও ডিমান্ড চার্জ বৃদ্ধির প্রস্তাব।
বিতরণ কোম্পানির নাম –ডিপিডিসি (DPDC)
গ্রাহক সংখ্যা / এলাকা -ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ (১৮ লাখ গ্রাহক)
চলতি অর্থবছরের লোকসান -১৩৬ কোটি টাকা
প্রস্তাবিত পরিবর্তন / দাবি -খুচরা পর্যায়ে ৬.৯৬% মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব এবং মিটার টেম্পারিং রোধে প্রিপেইড মিটারে সিকিউরিটি চার্জ অন্তর্ভুক্তির দাবি।
বিতরণ কোম্পানির নাম –নেসকো (NESCO)
গ্রাহক সংখ্যা / এলাকা -রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ (২২ লাখ গ্রাহক)
চলতি অর্থবছরের লোকসান -প্রতি ইউনিটে ৩ পয়সা ক্ষতি
প্রস্তাবিত পরিবর্তন / দাবি -নিট বিলিং রেট বর্তমানের ৯ টাকা ১৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা ৮ পয়সা করার প্রস্তাব।
বিতরণ কোম্পানির নাম –ওজোপাডিকো (WZPDCO)
গ্রাহক সংখ্যা / এলাকা -দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
চলতি অর্থবছরের লোকসান -৩১.৮৭ কোটি টাকা
প্রস্তাবিত পরিবর্তন / দাবি -খুচরা পর্যায়ে গড় দাম ১০% বৃদ্ধির আবেদন (লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য ৮% এবং অন্যদের জন্য ১২.২৫%)।
জনগণের স্বার্থই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার: বিইআরসি
ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির এই মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে চাল, ডাল, তেল ও গ্যাসের দাম দফায় দফায় বাড়ায় সাধারণ মানুষ এমনিতেই হিমশিম খাচ্ছে। এর ওপর নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়লে তা দেশের উৎপাদনশীল শিল্প খাত, সেবা খাত এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দেবে।
সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সদস্য (বিদ্যুৎ) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ শাহিদ সারওয়ার বলেন:
“বিতরণ কোম্পানিগুলোর দাম বাড়ানোর প্রস্তাবনা নিয়ে আমরা বর্তমানে বিশদ কাজ করছি। ২০-২১ মে (আজ ও আগামীকাল) এ বিষয়ে একটি উন্মুক্ত গণশুনানি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সেই শুনানিতে বিভিন্ন পক্ষের প্রাপ্ত মতামত, যুক্তি ও ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। বিইআরসি সবসময় জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে। নতুন দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর যাতে কোনো অন্যায্য বা অসহনীয় বাড়তি চাপ সৃষ্টি না হয়, কমিশন সেটি নিশ্চিত করবে।”
বাংলাফ্লো/এফআইআর






