বাংলাফ্লো ডেস্ক
ঢাকা: দীর্ঘ রাতভর টানটান উত্তেজনা আর দীর্ঘ পর্যালোচনার পর অবশেষে মঙ্গলবার (১৬ জুন) ভোর ৫টায় এল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর হওয়া নৃশংস হামলা ও এতে মদদ দেওয়ার অভিযোগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ১৯ জন শিক্ষক এবং দুজন কর্মকর্তার ভাগ্য নির্ধারণ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেট।
নতুন প্রশাসনিক ভবনে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে এই কঠোর শাস্তির রূপরেখা ঘোষণা করেন বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান। তিনি জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত ঘটনার প্রতিটি তথ্য-উপাত্ত যাচাই ও দীর্ঘ শুনানির পরই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যেন কোনো অপরাধী পার না পায় এবং কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি শাস্তি না পান।
চূড়ান্ত এই সিদ্ধান্তে একজন শিক্ষককে বাধ্যতামূলক অবসর, ৯ জন শিক্ষক ও এক কর্মকর্তাকে পদাবনতি বা বেতন অবনমন, দুজনকে সতর্কীকরণ এবং আটজনকে (৭ শিক্ষক ও ১ কর্মকর্তা) অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
বাধ্যতামূলক অবসর পেলেন ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেহেদী ইকবাল।
নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মহিবুর রৌফ শৈবালকে সরাসরি ‘প্রভাষক’ পদে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ডেপুটি রেজিস্ট্রার নাহিদুর রহমান খানকে ‘সহকারী রেজিস্ট্রার’ পদে পদাবনতি দেওয়া হয়েছে (তবে ২ বছর পর পদোন্নতির আবেদনের সুযোগ থাকছে)।
সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক আলমগীর কবির, সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আ স ম ফিরোজ-উল-হাসান ও অধ্যাপক বশির আহমেদ এবং পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের অধ্যাপক তাজউদ্দীন শিকদারকে বর্তমান পদের প্রারম্ভিক স্কেলে নামিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি আগামী ৫ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।
বাংলা বিভাগের অধ্যাপক নাজমুল হোসেন তালুকদার এবং অ্যাকাউন্টিং বিভাগের প্রভাষক কানন কুমার সেনের দুই বছরের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া সাবেক সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মোহাম্মদ মোস্তফা ফিরোজের বেতন দ্বিতীয় গ্রেডে নামিয়ে তাকেও ৫ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ইস্রাফিল আহমেদের বেতনও প্রারম্ভিক স্কেলে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে।
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ এ মামুনকে সতর্ক করার পাশাপাশি ৫ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্বে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক হোসনে আরাকে কেবল সতর্ক করা হয়েছে।
অন্যদিকে, দীর্ঘ তদন্ত শেষে অভিযোগ থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি পেয়েছেন আইবিএ-এর সহকারী অধ্যাপক পলাশ সাহা, পরিবেশবিজ্ঞানের অধ্যাপক শফি মোহাম্মদ তারেক, পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক জহিরুল ইসলাম খোন্দকার, লোকপ্রশাসনের অধ্যাপক মোহাম্মদ ছায়েদুর রহমান ও সহযোগী অধ্যাপক মনির উদ্দিন শিকদার, অর্থনীতির অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, মাইক্রোবায়োলজির অধ্যাপক আনোয়ার খসরু পারভেজ এবং সহকারী রেজিস্ট্রার রাজীব চক্রবর্তী।
প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে নাম আসায় তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক মো. নুরুল আলম, সাবেক সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মনজুরুল ইসলাম এবং সাবেক কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক রাশেদ আখতারের বিরুদ্ধেও কঠোর হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে পৃথক তিনটি স্ট্রাকচারাল কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিন্ডিকেট।
গত বছরের জুলাইয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল এবং উপাচার্যের বাসভবনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর সশস্ত্র হামলার ঘটনায় গত ৪ আগস্ট ছাত্রলীগের ১৮৯ জন নেতাকর্মীকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে ৪৩ জন শিক্ষার্থীর সাজা পুনর্বিবেচনা করেছে সিন্ডিকেট।
উপাচার্য জানান, চিরতরে বহিষ্কার হওয়া ২১ জনের মধ্যে ৫ জনকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। বাকিদের মধ্যে ৮ জনের সাজা কমিয়ে ২ বছর এবং ৫ জনের সাজা ১ বছর করা হয়েছে। এছাড়া ২ বছরের বহিষ্কারাদেশ পাওয়া ৮ জনের মধ্যে ৬ জনকে অব্যাহতি, সনদ বাতিল হওয়া ১২ জনের মধ্যে ৫ জনকে অব্যাহতি এবং ৪ জনের মেয়াদ কমিয়ে ১ বছর করা হয়েছে। সাময়িক বহিষ্কারে থাকা দুজনের মধ্যে একজনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। বাকিদের আগের শাস্তিই বহাল থাকছে।
বাংলাফ্লো/এফআইআর






