জেলা প্রতিনিধি
নেত্রকোণা: ‘মসজিদের বারান্দায় দুইজনকে ডেকে কোলে নিয়ে বলত—এটা আমার আম্মু, ওটা আমার বউ। গায়ে হাত দিয়ে বলত এগুলো আদর। টাকা দিয়ে বলত—এগুলো দিয়ে মজা খেতে। আমি বলতাম লাগবে না, জোর করে দিত। কখনো ১০০ টাকা, ৫০ টাকা বা ২০ টাকা দিত। চিৎকার করতে চাইলে মুখ চেপে ধরত।’—এভাবেই নিজের ওপর হওয়া পাশবিক নির্যাতনের ভয়ংকর বর্ণনা দিচ্ছিল নেত্রকোণার মদন উপজেলার ১২ বছর বয়সী এই মাদরাসাছাত্রী।
শিক্ষকের এই বিকৃত যৌনাচারের বলি হয়ে ১২ বছরের শিশুটি আজ ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। শারীরিক গঠন ও বয়সের কারণে তার জীবন এখন চরম ঝুঁকির মুখে। এই ঘটনায় ভুক্তভোগীর মা গত ২৩ এপ্রিল মদন থানায় একটি মামলা দায়ের করলেও প্রধান অভিযুক্ত মাদরাসা শিক্ষক ও ইমাম আমান উল্লাহ সাগর এখনো পলাতক রয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মদন উপজেলার কাইটাইল ইউনিয়নের বড়বাড়ী ভগবৎপুর এলাকায় ২০২২ সালে ‘হযরত ফাতেমাতুজ জোহরা (র.) কওমি মহিলা মাদরাসা’ স্থাপিত হয়। আমান উল্লাহ সাগর ওই মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষক। পাশাপাশি তিনি পাশের গ্রাম্য মসজিদে ইমামতিও করতেন। মসজিদ ও মাদরাসার মাঝে মাত্র ৫-৬ ফুট দূরত্বের একটি সরু হাঁটাপথ রয়েছে। মসজিদের বারান্দার উত্তর পাশে ইমামের বসবাসের জন্য একটি ছোট টিনের বেড়া দেওয়া কামরা আছে।
শিশুটির জবানবন্দি অনুযায়ী, দুপুর ১টায় টিফিন বা ছুটির পর তাকে সবার শেষে মসজিদ ও হুজুরের বিছানা ঝাড়ু দেওয়ার কথা বলে ওই কামরায় ডেকে নেওয়া হতো। এরপর দরজা আটকে চলত নির্যাতন। শিশুটি জানায়, প্রথমবার ধর্ষণের ২-৩ দিন পর তাকে পর্যায়ক্রমে ৩-৪ বার ধর্ষণ করা হয়। ঘটনা কাউকে জানালে মামা ও হুজুর মিলে মারধর করবে বলে ভয় দেখানো হতো। ভুক্তভোগী জানায়, তার সহপাঠী তানিয়াও (ছদ্মনাম) একইভাবে এই লালসার শিকার হয়েছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শিশুটির বাবা তাদের ছেড়ে নিরুদ্দেশ। মা জীবিকার তাগিদে সিলেটে গৃহপরিচারিকার কাজ করেন। শিশুটি তার নানা-নানির কাছে থেকে মাদরাসায় পড়ত। মা সম্প্রতি বাড়িতে ফিরে মেয়ের শারীরিক পরিবর্তন দেখে সন্দেহ করেন। চিকিৎসকের কাছে গেলে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হন।
স্বদেশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. সায়মা আক্তার জানান, শিশুটির গর্ভে থাকা ভ্রূণের বয়স প্রায় ২৭ সপ্তাহের বেশি (সাত মাসের বেশি)। মাত্র ১২ বছর বয়সী শিশুটির উচ্চতা সাড়ে চার ফুটের কম এবং ওজন মাত্র ২৯ কেজি। তার সরু কোমরের তুলনায় গর্ভস্থ বাচ্চার মাথার মাপ অনেক বেশি, যা শিশুটির জীবনের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
শিশুটির মা জানান, ঘটনা জানার পরপরই অভিযুক্ত সাগর এলাকা ছেড়ে পালান। এরপর সাগরের ভাই মামুন মিয়া (মামলার দ্বিতীয় আসামি, বর্তমানে জামিনে) টাকার বিনিময়ে বিষয়টি গোপনে মীমাংসা করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু শিশুটির মা তা প্রত্যাখ্যান করে আইনের আশ্রয় নেন।
পলাতক অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেছেন আমান উল্লাহ সাগর। সেখানে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, শিশুটি তার নানার সঙ্গে ঘুমাত এবং নানা তাকে জোর করে মাদরাসায় পাঠিয়েছিল। তবে কাইটাইল ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. সোহেল রানা সাগরের এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, “শিশুটির নানার বিরুদ্ধে এর আগে কোনো অভিযোগ শোনা যায়নি। আমরা এলাকাবাসী চাই, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক।”
স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ও অন্যান্য মাদরাসা শিক্ষকরাও এই ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম জানান, অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মামলা রুজু করা হয়েছে। তবে মামলা দায়েরের আগে থেকেই প্রধান আসামি পলাতক থাকায় তাকে এখনো গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ তাকে ধরতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। ভুক্তভোগী পরিবারকে কোনো ধরনের হুমকি দেওয়া হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।
বাংলাফ্লো/এফআইআর






