আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ঢাকা: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশাল অঙ্কের আর্থিক বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে চলমান হাই-প্রোফাইল জালিয়াতি ও ঘুষের মামলা থেকে চাঞ্চল্যকরভাবে রেহাই পেয়েছেন ভারতীয় ধনকুবের এবং আদানি গ্রুপের চেয়ারম্যান গৌতম আদানি। স্থানীয় সময় সোমবার (১৮ মে) যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিষয়ক মন্ত্রণালয় (ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস) আনুষ্ঠানিকভাবে আদানিকে এই মেগা মামলা থেকে পূর্ণ অব্যাহতি দিয়েছে।
একই সাথে আদানির মালিকানাধীন একটি সহযোগী কোম্পানির বিরুদ্ধে ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে বাণিজ্য করার যে গুরুতর অভিযোগ ছিল, তারও আইনি নিষ্পত্তি করেছে মার্কিন প্রশাসন। খবর রয়টার্সের।
যুক্তরাষ্ট্রে গৌতম আদানির প্রধান আইনি পরামর্শক রবার্ট গিউফ্রা রয়টার্সকে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। উল্লেখ্য, আইনজীবী রবার্ট গিউফ্রা বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও ব্যক্তিগত আইনজীবী হিসেবে কাজ করছেন।
গিউফ্রা রয়টার্সকে জানান, গৌতম আদানি নিজেই গত মাসে ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রে ১ হাজার কোটি (১০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার বিনিয়োগের একটি মেগা প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে মার্কিন বিচার বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা তখন আদানিকে সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, আদানির বিরুদ্ধে ফেডারেল আদালতে অপরাধমূলক মামলা চলমান থাকায় মার্কিন আইন অনুযায়ী এই বিনিয়োগ গ্রহণ করা সম্ভব নয়। আইনজীবী গিউফ্রা বলেন, “যেহেতু সোমবার মার্কিন সরকার তাঁর বিরুদ্ধে থাকা সমস্ত আইনি মামলা তুলে নিয়েছে, তাই এখন যুক্তরাষ্ট্রে আদানির সেই ১০ বিলিয়ন ডলারের মহাবিনিয়োগে আর কোনো আইনি বাধা রইল না।”
২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের একটি ফেডারেল আদালতে গৌতম আদানি, তাঁর ভাতিজা সাগর আদানি ও তাদের সাত শীর্ষ সহযোগীর বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও দুর্নীতির আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়েছিল।
সে মামলার চার্জশিটে বলা হয়েছিল, ভারতের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ একটি মেগা সৌরবিদ্যুৎ (Solar Power) প্রকল্পের কাজ বাগিয়ে নিতে দেশটির সরকারি কর্মকর্তাদের মোট ২৬ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা) ঘুষ প্রদান করেছিলেন গৌতম আদানি। এই বিপুল অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে প্রকল্পের একচেটিয়া ঠিকাদারির কাজ আদানির নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ‘আদানি গ্রিন এনার্জি’ (Adani Green Energy)-কে পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল।
ভারতীয় কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের ঘুষে রাজি করানোর পর, আদানি গ্রিন এনার্জি প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার সংগ্রহ করার মিশন শুরু করে। এই লক্ষ্যে তারা আন্তর্জাতিক বন্ডও বাজারে ছাড়ে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে গিয়ে আদানি গ্রিন এনার্জি নিজেদের প্রতিষ্ঠানকে সম্পূর্ণ ‘দুর্নীতিমুক্ত এবং ঘুষবিরোধী’ নীতি মেনে চলা স্বচ্ছ কোম্পানি হিসেবে মিথ্যা ও সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর তথ্য-উপাত্ত দিয়েছিল।
মার্কিন আদালতের তদন্তে উঠে আসে, যে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটির জন্য তারা আন্তর্জাতিক বাজারকে ধোঁকা দিয়ে বন্ড ছেড়েছিল, সেটি সফল হলে পরবর্তী ২০ বছরে আদানি গ্রুপের কমপক্ষে ২০০ কোটি ইউরোরও (২ বিলিয়ন ইউরো) বেশি নিট মুনাফা আসত। এই মার্কিন আইন লঙ্ঘনের জেরে অভিযোগ গঠনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ৬২ বছর বয়সী গৌতম আদানির নামে নিউইয়র্কের একটি আদালত আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও (Arrest Warrant) জারি করেছিল।
ভারতীয় এই সফল ব্যবসায়ী এশিয়ার তথা বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। মার্কিন প্রভাবশালী ব্যবসায়িক সাময়িকী ফোর্বস (Forbes)-এর রিয়েল-টাইম তথ্য অনুসারে, বর্তমান বাজারে গৌতম আদানির মোট ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার ২০০ কোটি মার্কিন ডলার। সমালোচকেরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের ‘ব্যাবসায়িক কূটনীতি’-কে কাজে লাগিয়ে নিজের বিশাল পুঁজির জোরে মার্কিন জেলের হাত থেকে রাতারাতি পার পেয়ে গেলেন আদানি, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন নজির তৈরি করল।
বাংলাফ্লো/এফআইআর






