আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ঢাকা: ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর বোর্দো থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে একটি সক্রিয় দাবানল। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে সব ধরনের সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে রাখার কথা জানিয়েছেন শহরটির মেয়র।
মেয়র টমাস কাজেনাভে এক বিবৃতিতে জানান, ‘ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের আগেই নিরাপদে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক দুর্গত মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য আমরা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করছি।’
এরই মধ্যে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ দাবানলে বিপর্যস্ত গিরোন্দ এলাকা পরিদর্শনে যান। সেখানে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তিনি জানান, এমন ভয়ংকর দাবানলের মুখে দেশটি আগে কখনো পড়েনি। তার মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্স বর্তমানে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
এই ভয়াল দাবানল থেকে বাঁচাতে ফ্রান্সে ইতোমধ্যে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তর করা হয়েছে। স্পেনেও একই কারণে এক লাখেরও বেশি মানুষ ঘরছাড়া। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের পশ্চিমাঞ্চলে আগুন এখন সম্পূর্ণ ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে’ চলে গেছে বলে জানা গেছে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, আজ মঙ্গলবার থেকে ওই অঞ্চলে নতুন করে তীব্র তাপপ্রবাহ শুরু হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এমনটি হলে আগুন নেভানোর কাজে নিয়োজিত কর্মীদের তৎপরতা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, ১০টি দাবানলের মধ্যে ৯টির পেছনেই মানবসৃষ্ট কারণ দায়ী। মানুষের অসচেতনতা, যেমন—সিগারেটের অবশিষ্টাংশ যত্রতত্র ফেলা, উন্মুক্ত স্থানে বারবিকিউ করা কিংবা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ছাড়াই কাজ করার ফলেই বেশিরভাগ আগুনের সূত্রপাত হয়।
প্রেসিডেন্ট মাখোঁ জানান, লঁদ এলাকায় ছড়িয়ে পড়া একটি ছোট দাবানল নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও পার্শ্ববর্তী গিরোন্দ এলাকায় আগুন নেভানোর কাজ এখনো চলমান। ২৪ ঘণ্টা আগের তুলনায় সোমবার অগ্নিনির্বাপক কর্মীরা কিছুটা উন্নতি করতে পেরেছেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘দমকা বাতাস এখনো অব্যাহত রয়েছে এবং তাপমাত্রা ফের বাড়ার শঙ্কা রয়েছে, তাই এখনই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার কোনো সুযোগ নেই।’
বোর্দো শহরের দক্ষিণাংশে অবস্থিত সেস্তাস শহরের মেয়র জেরোম স্তেফ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে বলেন, ‘এটি হয়তো শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াল দাবানল হতে যাচ্ছে।’ তিনি জানান, আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় দুই দিন আগে রাতের আঁধারে তার শহরের ১৭ হাজার মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়।
তার দেওয়া তথ্যমতে, এই এলাকায় এখন পর্যন্ত ৪২ হাজার হেক্টর (১ লাখ ৩ হাজার একর) ভূমি ভস্মীভূত হয়েছে এবং অন্তত ২৪০টি বসতবাড়ি ধ্বংস হয়েছে। তিনি নিজ শহরের বর্তমান অবস্থাকে অত্যন্ত ভয়াবহ বলে বর্ণনা করেন।
আগুনের তীব্রতা কিছুটা কমলেও বাতাসের গতিপথ পরিবর্তন ও জ্বলন্ত অঙ্গার উড়ে আসার কারণে এখনো বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করেন জেরোম স্তেফ। তার মতে, অগ্নিনির্বাপক দল এখন পর্যন্ত কেবল একটি ছোট লড়াইয়ে জয়ী হয়েছে। তিনি আরও জানান, আগুনের আগ্রাসন ঠেকাতে বিস্তীর্ণ এলাকার গাছপালা কেটে ফায়ারব্রেক (প্রতিরক্ষামূলক পরিখা) তৈরিতে তারা সর্বোচ্চ শক্তি নিয়োগ করেছেন। বর্তমান পরিস্থিতি সবাইকে চরম আতঙ্কের মধ্যে রেখেছে।
এদিকে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু সতর্ক করে জানিয়েছেন, দেশটি এমন এক দাবানল মৌসুম পার করছে, যার কোনো অতীত নজির নেই। চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে এ পর্যন্ত ফ্রান্সে ১৩ হাজার ৫৬৬টি দাবানল রেকর্ড করা হয়েছে, যাতে পুড়ে ছাই হয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৮৫ হেক্টর (২ লাখ ৮৬ হাজার ৮৫২ একর) জমি।
প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু আরও স্পষ্ট করেন, এসব আগুনের সবগুলো নিছক দুর্ঘটনা নয়; বেশ কিছু ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আগুন লাগানোর অভিযোগে গত ৬ জুলাই থেকে অন্তত ১৬২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর বাইরেও ফ্রান্সের হোত-কর্স এলাকা (কর্সিকা দ্বীপ), লঁদ এবং ভারের মতো বিভিন্ন অঞ্চলে দাবানল এখনো অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাফ্লো/এম এইচ এইচ











