বাংলাফ্লো প্রতিবেদক
ঢাকা: ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনার জেরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক লাইসেন্স বাতিল হওয়ার পর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতাল ছাড়তে শুরু করেছেন রোগীরা। শুক্রবার (১২ জুন) দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত ১৭৬ জন রোগী হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেছেন। আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের পরিচালক (কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) তারিকুল ইসলাম মুকুল জানান, বৃহস্পতিবার বিকালে যখন লাইসেন্স বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হয়, তখন হাসপাতালে ৪২৬ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। বর্তমানে প্রায় ২৫০ জনের মতো রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। নতুন করে জরুরি বিভাগ বা অন্য কোথাও কোনো রোগী ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না, তবে ভর্তি থাকা রোগীদের চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রয়েছে।
হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, যাদের শারীরিক অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল, তারা ছাড়পত্র নিয়ে চলে যাচ্ছেন। নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা আনিসুর রহমান জানান, তার বাচ্চা সুস্থ হওয়ায় তারা হাসপাতাল ছাড়ছেন। তবে সাতক্ষীরা থেকে আসা বি এম রাসেলের মতো অনেকেই পড়েছেন দুশ্চিন্তায়। স্ত্রীর ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসা করানো রাসেল জানান, হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গেলে ফলোআপ চিকিৎসার জন্য তারা কোথায় যাবেন বা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে কীভাবে পাবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। অন্যদিকে, চিকিৎসাধীন অনেক রোগীর শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় এখনই হাসপাতাল ছাড়তে চাইছেন না তাদের স্বজনরা। রাজধানীর মধুবাগ এলাকার বাসিন্দা আব্দুল্লাহ জানান, তার নবজাতক শিশু এনআইসিইউতে ভর্তি রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা প্রায় অসম্ভব। তিনি দাবি করেন, দোষীদের শাস্তি দেওয়া হোক, কিন্তু এভাবে পুরো হাসপাতাল বন্ধ করে দিলে সাধারণ মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হবে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা সেলিনা বেগম এবং গাজীপুরের আসমা ইসলামও তাদের অসুস্থ শিশুদের নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন পার করছেন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতাল ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
এর আগে, গত ২৭ মে সকালে মগবাজারে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছয় নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি, দীর্ঘক্ষণ এসি বন্ধ থাকা এবং বিকল্প ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা না থাকায় বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়াই শিশুগুলোর মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হওয়ায় বৃহস্পতিবার লাইসেন্স বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এদিকে, শুক্রবার দুপুরে সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া একটি বেসরকারি টেলিভিশনের কর্মীদের ওপর হাসপাতাল কর্মীরা চড়াও হন বলে অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে সংবাদকর্মীরা হাসপাতাল ত্যাগ করতে বাধ্য হন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানিয়েছেন, লাইসেন্স বাতিলের পর হাসপাতালটি আর কোনো চিকিৎসা দিতে পারবে না, তাই যত দ্রুত সম্ভব রোগীদের সরিয়ে নিতে হবে। তবে নিয়মানুযায়ী লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের পরিচালক তারিকুল ইসলাম মুকুল জানান, তারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং আগামী রোববারের মধ্যেই আপিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন। তিনি আরও বলেন, চাইলেই এত দ্রুত সব রোগীকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয় বলেই তারা চিকিৎসাধীনদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এখন আপিলের পর কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে হাসপাতালটি এবং সেখানে ভর্তি থাকা রোগীদের ভবিষ্যৎ।
বাংলাফ্লো/এফআইআর






