লাইফ স্টাইল ডেস্ক
ঢাকা: স্বর্ণ বা সোনা কেবল আভিজাত্যের প্রতীক নয়, এটি বিপদের বন্ধু এবং নিরাপদ বিনিয়োগের অন্যতম মাধ্যম। তবে স্বর্ণ কেনার সময় ক্যারেট, খাদ, হলমার্ক বা ওজনের হিসাব না বোঝার কারণে অনেকেই প্রতারিত হওয়ার ভয়ে থাকেন। আপনার দেওয়া তথ্যের আলোকে স্বর্ণ কেনার আগে একজন ক্রেতার যা যা জানা অত্যন্ত জরুরি, তা নিচে সহজভাবে তুলে ধরা হলো:
১. ক্যারেট ও ব্যবহারের পার্থক্য
স্বর্ণের বিশুদ্ধতা মাপা হয় ‘ক্যারেট’ দিয়ে। ক্যারেট যত বেশি, স্বর্ণ তত খাঁটি।
২৪ ক্যারেট (৯৯.৯% খাঁটি): এটি প্রায় শতভাগ বিশুদ্ধ স্বর্ণ। এটি খুব নরম হয় বলে গহনা তৈরির অনুপযুক্ত। সাধারণত কয়েন বা বিস্কুট হিসেবে বিনিয়োগের জন্য এটি কেনা হয়। হলমার্ক কোড: ৯৯৯.৯।
২২ ক্যারেট (৯১.৬৭% খাঁটি): গহনা তৈরির জন্য এটি সবচেয়ে জনপ্রিয়। সামান্য খাদ মিশিয়ে একে শক্ত করা হয়। হলমার্ক কোড: ৯১৬।
২১ ক্যারেট (৮৭.৫% খাঁটি): নিত্যব্যবহার্য গহনা (যেমন- চেইন, ব্রেসলেট) তৈরির জন্য এটি উপযোগী। এটি বেশ টেকসই। হলমার্ক কোড: ৮৭৫।
১৮ ক্যারেট (৭৫% খাঁটি): হীরা বা দামি পাথর বসানো গহনার জন্য এটি সেরা। কারণ এটি শক্ত এবং পাথরকে মজবুতভাবে ধরে রাখতে পারে। হলমার্ক কোড: ৭৫০।
২. খাদ বা ভেজাল কী?
গহনা টেকসই করতে খাঁটি স্বর্ণের সঙ্গে তামা, রুপা, দস্তা বা নিকেলের মতো ধাতু মেশানো হয়, একেই ‘খাদ’ বলে। খাদ মেশানো দোষের কিছু নয়, বরং গহনার স্থায়িত্বের জন্য এটি জরুরি। তবে নির্ধারিত অনুপাতে বেশি খাদ মেশানো হলে সেটি প্রতারণা।
সতর্কতা: ‘কেডিএম’ (KDM) বা ক্যাডমিয়াম মেশানো স্বর্ণ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় এটি পরিহার করা উচিত।
৩. ওজনের হিসাব (ভরি বনাম গ্রাম)
বাংলাদেশে ‘ভরি’র হিসাব প্রচলিত থাকলেও আন্তর্জাতিক ও ব্যবসায়িক মানদণ্ড হলো ‘গ্রাম’।
১ ভরি = ১১.৬৬ গ্রাম।
১ ট্রয় আউন্স = ৩১.১০ গ্রাম (২.৪৩ ভরি)।
১ আনা = ৮ রতি (১৬ আনায় ১ ভরি)।
৪. খাঁটি স্বর্ণ চেনার উপায় (হলমার্ক)
স্বর্ণের গায়ে খোদাই করা ছোট নম্বর বা ‘হলমার্ক’ দেখেই বিশুদ্ধতা যাচাই করা সম্ভব। বাজুস (BAJUS) বর্তমানে ডিজিটাল অ্যাপের মাধ্যমে হলমার্ক যাচাইয়ের ব্যবস্থা করছে।
একনজরে ক্যারেট ও হলমার্ক চার্ট:

খাঁটি স্বর্ণ চেনার সব থেকে সহজ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত উপায় হচ্ছে হলমার্ক টেস্ট। হলমার্ক হচ্ছে অলংকারের গায়ে খোদাই করে চিহ্নিত নির্দিষ্ট সংখ্যা যা স্বর্ণের গুণগত মান সম্পর্কে ধারণা দেয়।
আন্তর্জাতিক গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুসারে, হলমার্ক সংখ্যা হিসেবে ২৪ ক্যারেট স্বর্ণের জন্য ৯৯৯.৯, ২২ ক্যারেটের জন্য ৯১৬, ২১ ক্যারেটের জন্য ৮৭৫ এবং ১৮ ক্যারেটের জন্য ৭৫০ সংখ্যা ব্যবহার হয়। এই সংখ্যাগুলো নির্দিষ্ট ক্যারেটের পরিচয় হিসেবে গহনার গায়ে খোদাই করে লেখা থাকে।
বাংলাদেশে হলমার্ক করা স্বর্ণের অলংকার বিক্রি বাধ্যতামূলক করা হলেও তা অনেক জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানই এখনো মানছে না বলে জানান স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা। বাজুস সভাপতি এনামুল হক খান দোলন গণমাধ্যমকে বলেন, গহনা কেনার সময় ক্যারেট অনুযায়ী গহনার গায়ে থাকা হলমার্ক সিলটি দেখে নেওয়া জরুরি।
তিনি জানান, বাংলাদেশে জুয়েলারি ব্যবসায় জড়িত সবাই যেন হলমার্ক করা স্বর্ণ ব্যবহার করেন সেটি নিশ্চিতে কাজ করছেন তারা। গণমাধ্যমকে মি. দোলন বলেন, ‘আমরা হলমার্কিংয়ের জন্য অনলাইন পদ্ধতি চালু করছি। একটি কোডের মাধ্যমে মোবাইল অ্যাপ দিয়ে গ্রাহক সহজেই জানতে পারবেন যে গহনাটি তিনি কিনছেন সেটা কোন দোকান থেকে কেনা, কত ক্যারেট, আসল না নকল।’
এছাড়া স্বর্ণের আসল-নকল যাচাইয়ে নাইট্রিক এসিড টেস্ট, চুম্বক পরীক্ষা, পানির পরীক্ষা এবং সিরামিক প্লেট টেস্টের মতো কিছু প্রচলিত পদ্ধতিও রয়েছে।
হলমার্ক করার পাশাপাশি ‘কেডিএম সোনা’ নামেও একটি ধরনের স্বর্ণের প্রচলন রয়েছে। যেখানে নরম স্বর্ণকে গহনা তৈরির উপযোগী করতে ক্যাডমিয়াম নামক এক ধরনের ধাতু মেশানো হয়।
ক্যাডমিয়াম মেশানোর ফলে স্বর্ণের মান বজায় থাকলেও গহনার কারিগর এবং ব্যবহারকারীদের স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে বলে বর্তমানে স্বর্ণে ক্যাডমিয়াম মেশানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
গত কয়েক বছর ধরেই উর্ধ্বমুখী স্বর্ণের বাজার। পাঁচ বছরের ব্যবধানে প্রায় তিনগুণ হয়েছে মূল্যবান এই ধাতুর দাম।
এই সময় অনেকে যেমন স্বর্ণ ক্রয়ের পরিমাণ কমিয়েছেন আবার অনেকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণ কিনছেনও।
সম্প্রতি বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণের সর্বোচ্চ দাম পৌঁছেছিল দুই লাখ ৮৬ হাজার টাকার কাছাকাছি। অস্থির স্বর্ণের বাজারে দাম ওঠানামা করছে অনেক বেশি। এমন প্রেক্ষাপটে স্বর্ণের দাম নির্ধারণ এবং এর একক সম্পর্কেও ধারণা রাখা জরুরি।
কারণ স্বর্ণের ওজন মাপার আন্তর্জাতিক একক এবং বাংলাদেশে প্রচলিত এককের কারণে সঠিক দাম বুঝতে অনেক সময় জটিলতা তৈরি হয়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বর্ণ, রূপাসহ এই ধরনের দামি ধাতুর ওজন মাপার জন্য ‘ট্রয় আউন্স’ একক ব্যবহার করা হয়, যা আউন্স এককের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। এছাড়া স্বর্ণের জন্য ‘গ্রাম’ একক অনেক বেশি প্রচলিত। এক আউন্স সমান ২৮ দশমিক ৩৫ গ্রাম হলেও, এক ট্রয় আউন্স সমান ৩১ দশমিক ১০ গ্রাম।
অবশ্য বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় স্বর্ণের ওজনের ক্ষেত্রে প্রাচীন ভারতীয় ওজন পরিমাপের একক ‘ভরি’ শব্দটি অত্যন্ত পরিচিত। এছাড়া রতি এবং আনা এককগুলোও প্রচলিত। সংখ্যার হিসেবে, এক ভরি সমান ১১ দশমিক ৬৬ গ্রাম এবং ২ দশমিক ৪৩ ভরি সমান এক ট্রয় আউন্স। আর আট রতি সমান এক আনা এবং ১৬ আনায় এক ভরি।
মূলত ব্রিটিশ আমল থেকে ভরি শব্দটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। আন্তর্জাতিক দশমিক পদ্ধতি আসার অনেক আগে থেকেই এই অঞ্চলে মানুষ ‘রতি’, ‘আনা’ এবং ‘ভরি’র হিসেবে অভ্যস্ত ছিল।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন এর সভাপতি এনামুল হক খান দোলন বলছেন, ‘পূর্বের জেনারেশন যারা এখনো জীবিত আছেন তারা এটাতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কিন্তু আমাদের যত হিসাব-নিকাশ বা নতুন জেনারেশন যারা এই ব্যবসাতে আছে তারা সবাই গ্রামে হিসাব করে।’
তার মতে, স্বর্ণের ওজন হিসাবের জন্য ‘গ্রাম’ হলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, তাই গ্রাম ব্যবহার করাই বেশি নির্ভুল।
বাংলাফ্লো/এফআইআর






