বাংলাফ্লো প্রতিবেদক
ঢাকা: গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে গুমের ঘটনার ভয়াবহ ও পৈশাচিক চিত্র তুলে ধরেছে। রোববার (৪ জানুয়ারি) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। কমিশন মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগের মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে নিশ্চিতভাবে ‘গুম’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তবে কমিশন সদস্য নাবিলা ইদ্রিস জানান, প্রকৃত গুমের সংখ্যা ৪ থেকে ৬ হাজার হতে পারে, কারণ ভয়ের কারণে অনেকে মুখ খোলেননি বা দেশত্যাগ করেছেন। তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে, এসব গুমের পেছনে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল এবং এটি ছিল ‘পলিটিক্যালি মোটিভেটেড ক্রাইম’। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গুমের শিকার হয়ে যারা জীবিত ফিরেছেন তাদের ৭৫ শতাংশই জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী এবং ২২ শতাংশ বিএনপির। অন্যদিকে, যারা এখনো নিখোঁজ, তাদের ৬৮ শতাংশ বিএনপি এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী।
প্রতিবেদনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁনের বিরুদ্ধে গুমের ঘটনায় সরাসরি সম্পৃক্ততা ও নির্দেশনার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, সালাহউদ্দিন আহমেদ, হুম্মাম কাদের চৌধুরী এবং জামায়াত নেতা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আমান আযমী ও ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেমের মতো হাই প্রোফাইল ব্যক্তিদের গুমের ঘটনায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশ ছিল। এছাড়া ভুক্তভোগীদের আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই গোপনে ভারতে হস্তান্তর বা ‘রেন্ডিশন’-এর বিষয়টিও তদন্তে উঠে এসেছে। সবচেয়ে লোমহর্ষক তথ্য হলো, বিচারবহির্ভূত হত্যার পর লাশ গুম করতে বরিশালের বলেশ্বর নদীকে ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে শত শত মরদেহ ফেলা হয়েছে। এছাড়াও বুড়িগঙ্গা ও মুন্সিগঞ্জেও লাশ গুমের প্রমাণ মিলেছে।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই প্রতিবেদনকে একটি ‘ঐতিহাসিক দলিল’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, গণতন্ত্রের লেবাস পরে মানুষের ওপর কী ধরনের পৈশাচিক আচরণ করা হয়েছে, এটি তার ডকুমেন্টেশন। তিনি বলেন, “মানুষ কত নিচে নামতে পারে, কত পৈশাচিক হতে পারে—এই রিপোর্ট তার প্রমাণ।” তিনি আয়নাঘরের পাশাপাশি বধ্যভূমি ও লাশ গুমের স্থানগুলোর ম্যাপ তৈরি করার নির্দেশ দেন। কমিশন ভিক্টিমদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন করার সুপারিশ করেছে। প্রধান উপদেষ্টা কমিশনের সদস্যদের তাদের দৃঢ় মনোবল ও অক্লান্ত পরিশ্রমের জন্য ধন্যবাদ জানান এবং ভবিষ্যতে যেন এমন নৃশংসতা আর না ঘটে, তার পথ বের করার আহ্বান জানান।
বাংলাফ্লো/এফআইআর






