দেশের ইতিহাসে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান এক ঐতিহাসিক পথনির্দেশক। যেটি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানসমূহের পুনর্গঠন ও স্বাধীনতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। যেখানে দেশের বিচার বিভাগ অন্যতম। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও সংস্কার এখন জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংস্কারের প্রাসঙ্গিকতা:
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হচ্ছে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার মূলভিত্তি। স্বাধীন বিচার বিভাগ ছাড়া আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়না, সেক্ষেত্রে স্বৈরাচারী বা রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পায়। একটি স্বাধীন বিচার বিভাগই পারে দেশের সরকারের কর্মকাণ্ডকে সংবিধানসম্মত সীমার মধ্যে রাখতে এবং জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে। আমাদের সংবিধানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। অন্যদিকে, ডিজিটাল এই যুগে অনলাইনে মামলা পরিচালনা, বহুমাত্রিক সাইবার অপরাধের বিচার, মানবাধিকার রক্ষা ও দুর্নীতি প্রতিরোধের আইনী সুরক্ষার ক্ষেত্রে আধুনিক বিচার ব্যবস্থা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। তাই দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে বিচার বিভাগের সংস্কার প্রাসঙ্গিক হয় পড়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, বিচার বিভাগের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। আমাদের বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে একটি পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা।
বিচার বিভাগ সংস্কারে প্রধান বিচারপতির রোডম্যাপ:
দেশের ২৫তম প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর এক অভিভাষণে বিচার বিভাগ সংস্কারের ঐতিহাসিক রোডম্যাপ তুলে ধরেন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ। সে রোডম্যাপের আলোকে গৃহীত পদক্ষেপগুলো এখন বিচার বিভাগের কাঙ্ক্ষিত সংস্কারে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ, বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় (প্রতিষ্ঠার ‘দ্বারপ্রান্তে’), বিচার সেবা প্রদানে স্বচ্ছতা আনতে ১২ দফা নির্দেশনা, পেপার ফ্রি হাইকোর্ট বেঞ্চ চালু, লিগ্যাল এইড প্রদানে ক্যাপাসিটি টেস্ট চালু, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস গঠন বিধিমালা প্রণয়ন, দেওয়ানি ও ফৌজদারি এখতিয়ার অনুসারে পৃথক আদালত চালু, অধস্তন আদালতের বিচারক সংখ্যা বৃদ্ধি, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনর্গঠন, উচ্চ আদালতের বিচারপতি নিয়োগে ‘সুপ্রিমজুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ গঠন, আদালত প্রাঙ্গণসহ বিচারকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সুপ্রিম কোর্ট হেল্পলাইন ও সারাদেশের আদালতে হেল্পলাইন চালু, প্রধান বিচারপতি ফেলোশিপ চালু এবং দেশের চৌকি আদালতে কম্পিউটার প্রদানসহ প্রধান বিচারপতির নানা উদ্যোগ।
উচ্চ আদালতের রায়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা:
সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর রিভিউ নিষ্পত্তির রায়ের ফলে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদ সদস্যদের হাত থেকে ফিরে আসে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে ৬ বিচারপতির আপিল বিভাগের বেঞ্চ গত ২৪ অক্টোবর এই রায় দেন। অন্যদিকে, অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ (নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ও ছুটি) এবং শৃঙ্খলা বিধানের ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের কাছ থেকে ফিরে আসে সুপ্রিম কোর্টের হাতে। ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার রায় দেন। সেই সাথে বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় তিন মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠার জন্য এই রায়ে নির্দেশ দেয়া হয়।
ঐতিহাসিক এই রায়ের পর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, ’এ রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা হলো এবং এ রায়ের মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের করায়ত্ব এবং রাজনৈতিক প্রভাব থেকে অধস্তন বিচার বিভাগ মুক্তি পেল।’
বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা:
বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসে কর্মরত সব বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের (স্বামী/স্ত্রী, পুত্র ও কন্যা) দেশে ও বিদেশে অবস্থিত সম্পদের হিসাব বিবরণী জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। এদিকে, আদালতে বিচারপ্রার্থীর অভিযোগ জমা নেয়ার জন্য রয়েছে অভিযোগ বক্স। যা বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অংশ। অন্যদিকে, বিচারিক সচ্ছলতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে আদালতের বিচারিক কার্যক্রম জনগণকে জানার ও দেখার সুযোগ করে দেয়া। সে দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান চব্বিশের জুলাই আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা বিচারিক সচ্ছলতার অনন্য উদাহরণ।
বিচার ব্যবস্থার সংস্কারে নাগরিকদের অংশগ্রহণ:
বিচার বিভাগের সংস্কার শুধু বিচারক, আইনজীবী বা সরকারের মধ্যে সিমাবদ্ধ বিষয় নয়। এক্ষেত্রে নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিকরা বিচারব্যবস্থার ত্রুটি, দুর্নীতি, বিলম্ব ও বৈষম্য সম্পর্কে সচেতন হলে সংস্কারের দাবি জোরালো হয়। এছাড়া সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নাগরিক ফোরামের মাধ্যমে জনমত গঠন সংস্কারকে ত্বরান্বিত করে। নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার সংগঠন, নারী ও সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর মতামত সংস্কার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিচার বিভাগের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা:
বিচার বিভাগের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বলতে বোঝানো হয়— বিচারবিভাগ যেন সরকারের নির্বাহী বা আইন প্রণয়নকারী বিভাগের আর্থিক নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে নিজস্বভাবে বাজেট প্রণয়ন, অর্থব্যয় ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এটি বিচার বিভাগের সার্বিক স্বাধীনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন এটি প্রশাসনিক, কার্যকরী এবং অর্থনৈতিক— সব দিক থেকেই নির্বাহী প্রভাবমুক্ত থাকবে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত হলে বিচার বিভাগের জবাবদিহি, দক্ষতা ও জনবিশ্বাস বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
বিচারিক স্বাধীনতার জন্য জনমত গঠন:
বিচারিক স্বাধীনতার গুরুত্ব জনগণের কাছে সহজভাবে তুলে ধরা ও ইতিবাচক জনমত গঠন করা গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীন বিচারব্যবস্থার কারণে সমাজে কীভাবে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়, এমন ইতিবাচক উদাহরণ প্রচার করার মাধ্যমে জনমত গঠন সম্ভব। এছাড়া স্কুল–কলেজে আলোচনাসভা বা বিতর্ক আয়োজন করে তরুণদের এই বিষয়ে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।
আদালতকে বহিরাগত প্রভাবমুক্ত রাখা:
দেশের আদালতকে বহিরাগত প্রভাবমুক্ত রেখে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক শর্ত। আদালত তখনই বহিরাগত প্রভাবমুক্ত থাকবে, যখন বিচারকরা যোগ্য ও সৎ হবেন, নিয়োগ ও প্রশাসনিক কাঠামো স্বাধীন হবে, এবং রাষ্ট্রীয় অন্য কোনো অঙ্গ তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করতে পারবে না।
সংস্কারের দৃষ্টান্ত বিচারপ্রার্থীর জন্য হেল্পলাইন :
বিচারপ্রার্থী জনগণের জন্য সারাদেশের আদালতে হেল্পলাইন সেবা চালু করা হয়েছে। যেটি বিচার বিভাগের সংষ্কারের অন্যতম একটি দিক। দেশের সকল নাগরিকের আদালত ও বিচার সংক্রান্ত তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করণের লক্ষ্যে দেশের সকল অধস্তন আদালত ও ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে হেল্পলাইন চালু করা হয়েছে। দেশের ৬৪ জেলা ও আটটি মহানগর এলাকায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আদলে চালু করা হেল্পলাইনের মাধ্যমে বিচারপ্রার্থী বা সেবাগ্রহীতা সরাসরি ফোন কল অথবা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করে আইন-আদালত ও বিচারিক তথ্য পেতে পারেন।
বিচারপ্রক্রিয়ার সময়সীমা কমানোর পদক্ষেপ:
দেশের বিচার বিভাগের সামনে অন্যতম বড় সমস্যা হলো বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা ও মামলা জট। এটি শুধু বিচারপ্রার্থীর ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে বাধা নয়, বরং বিচার বিভাগের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা ও মামলা জট কমাতে সুপ্রিম কোর্ট এবং সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহন করেছে। সম্প্রতি ‘আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে সরকার লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে ৯টি আইনের বিরোধ মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির উদ্যোগ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করেছে। এর ফলে চেক ডিজ-অনার, পারিবারিক বা সম্পদ সংক্রান্ত বিরোধের মামলাগুলো দায়েরের আগে লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে নিষ্পত্তির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা ও মামলা জট কমাতে এই পদক্ষেপকে আশার আলো হিসেবেই দেখছেন আইন আদালত সংশ্লিষ্ট অনেকে। এক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, মামলা জট নিরসনের জন্য পদ্ধতিগত সংষ্কার দরকার। আমাদের যে চতুর্থ ও পঞ্চম স্তর বিশিষ্ট বিচার ব্যবস্থা এতে বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা হয় বলে আমি মনে করি। এছাড়া মিথ্যা মামলা রোধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। মিথ্যা মামলাকারীকে কঠোর বিচারের আওতায় আনলে মামলার স্তুপ থেকে অনেকাংশেই আমরা রেহাই পাবো। আর দেওয়ানী মামলার ক্ষেত্রে কোর্টের চেয়ে বিকল্প উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তিকে বাধ্যতামূলক করলে আদালত মামলা জট থেকে অনেকাংশে মুক্তি পাবে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে বিচার বিভাগের তুলনা:
বাংলাদেশের বিচার বিভাগ সংবিধান অনুযায়ী স্বাধীন হলেও কার্যকর স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা ও দক্ষতা অর্জনে এখনো অনেক পথ বাকি। এবিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম বলেন, দেশের বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা আন্তর্জাতিক মান বা সেরা অনুশীলনের সঙ্গে তুলনা করতে হলে বিভিন্ন দিক থেকে এর মূল্যায়ন করতে হয়। যেমন স্বাধীনতা, দক্ষতা, প্রাপ্যতা, স্বচ্ছতা এবং সততা।বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বহু আনুষ্ঠানিক মানদণ্ড পূরণ করলেও রাজনৈতিক প্রভাব, প্রক্রিয়াগত অদক্ষতা এবং সীমিত স্বচ্ছতার কারণে কিছু ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়ে গেছে। তবে প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের দূরদর্শী নেতৃত্বে চলমান সংস্কারমূলক উদ্যোগ বিচারব্যবস্থাকে অধিক কার্যকর, স্বচ্ছ ও জনগণের কাছে সহজলভ্য করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সর্বোপরি, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক মান ও সেরা অনুশীলনের সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলছে।


