দুই প্রতিবেশী দেশ ও একসময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র এখন পরিণত হয়েছে পরস্পরের শত্রুতে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্তে টানা সংঘর্ষে প্রতিদিন ঝরছে রক্ত। কিন্তু এই বৈরিতা হঠাৎ তৈরি হয়নি। এর শিকড় লুকিয়ে আছে প্রায় ১৩০ বছর আগের একটি চুক্তি। চুক্তিটির নাম ডুরান্ড চুক্তিতে।
কী এই ‘ডুরান্ড চুক্তি’?
১৮৯৩ সালে আফগান আমির আবদুর রহমান খান ও ব্রিটিশ ভারতের পররাষ্ট্র সচিব স্যার মর্টিমার ডুরান্ডের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় একটি সীমান্ত চুক্তি। যা ‘ডুরান্ড চুক্তি’ নামে পরিচিত। এই চুক্তিতে আফগানিস্তানের ভেতরকার পশতু অধ্যুষিত অঞ্চল বিভক্ত হয়ে পড়ে ব্রিটিশ ভারতের অধীনে। এই বিভাজন রেখাই পরে পরিচিত হয় ‘ডুরান্ড লাইন’ নামে। আফগানদের চোখে এটি ছিল অন্যায্য ঔপনিবেশিক চুক্তি। যা তাদের জাতিগত ও ভূখণ্ডগত ঐক্য ভেঙে দেয়। কিন্তু ব্রিটিশদের কাছে এটি ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের নিরাপত্তা বলয়।
পাকিস্তানের জন্ম, ডুরান্ড লাইনে সীমান্ত সংকট
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি হলে, নতুন রাষ্ট্রটি ডুরান্ড লাইনকে তার বৈধ সীমান্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু আফগানিস্তান তা প্রত্যাখ্যান করে। এমনকি পাকিস্তানের জাতিসংঘ সদস্যপদেও আফগানিস্তানই ছিল একমাত্র দেশ, যে না ভোট দিয়েছিল।
এভাবেই শুরু হয় দুই প্রতিবেশীর অবিশ্বাসের ইতিহাস। শুরু হয় পাকিস্তান–আফগান সীমান্ত সংকট।

নতুন করে বন্ধুত্ব
১৯৮০-এর দশকে সোভিয়েত আগ্রাসনের সময় পাকিস্তান ছিল আফগান মুজাহিদদের আশ্রয়স্থল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইসলামাবাদ তখন কাবুলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র। কিন্তু সোভিয়েত প্রত্যাহারের পর মুজাহিদদের ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়, আর পাকিস্তান তখন থেকে একদল, বিশেষ করে তালেবানদের, পৃষ্ঠপোষকতা করতে থাকে। ১৯৯৬ সালে তালেবান ক্ষমতায় আসে ইসলামাবাদের প্রত্যক্ষ সহায়তায়। তখনও মনে হচ্ছিল দুই দেশ বন্ধুত্বের এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে।
নাইন ইলেভেন, বন্ধুত্বে ফাটল
২০০১ সালের নাইন ইলেভেনে হামলার ঘটনার পর পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট সন্ত্রাস দমনের জন্য আফগানিস্তানে হামলা চালায়, আর পাকিস্তান বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ দিতে। এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয় আফগানিস্তানের তালেবান সরকার। যারা পাকিস্তানকে বিশ্বাসঘাতক বলে ঘোষণা করে। এর ফলাফল পাকিস্তান সীমান্তে সন্ত্রাসী অনুপ্রবেশ, টিটিপি অর্থাৎ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান-এর উত্থান এবং পাকিস্তানের ভেতরে একের পর এক হামলা।
বর্তমান সংঘাত, ডুরান্ড লাইনে রক্তপাত
২০২১ সালে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার ও তালেবান সরকারের পুনরাগমন নতুন আশা জাগালেও বাস্তবতা ভিন্ন। তালেবান এখন বলছে তারা ডুরান্ড লাইনকে স্বীকৃতি দেয় না। অন্যদিকে পাকিস্তান সীমান্তে দেয়াল, বেড়া ও নতুন চৌকি স্থাপন করছে। এর মধ্যেই টিটিপি পাকিস্তানে হামলা বাড়িয়েছে, আর ইসলামাবাদ বলছে তালেবান তাদের আশ্রয় দিচ্ছে। সম্প্রতি কুরাম ও উত্তর ওয়াজিরিস্তানে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন পাঁচ পাকিস্তানি সেনা ও অন্তত ২৫ জন সশস্ত্র যোদ্ধা। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই উত্তেজনা পূর্ণাঙ্গ সীমান্তযুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
এই পরিস্থিতির ভবিষ্যত
১৩০ বছরের পুরনো সীমান্তচুক্তি আজও রক্তে লেখা হচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে বিশ্বাসের অভাব, সন্ত্রাসবিরোধী নীতির পার্থক্য এবং আঞ্চলিক প্রভাবের লড়াই—সব মিলিয়ে আফগান–পাকিস্তান সম্পর্ক এখন সবচেয়ে নাজুক অবস্থায়। প্রশ্ন রয়ে যায় — এই দুই মুসলিম প্রতিবেশী কি ইতিহাসের দেয়াল পেরিয়ে নতুন আস্থার পথ খুঁজে পাবে? নাকি ডুরান্ড লাইন হয়ে থাকবে তাদের মধ্যে চিরস্থায়ী বিভেদের প্রতীক?
এক শতাব্দীর বেশি সময় আগে আঁকা এক রেখা আজও দুই জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করছে। ডুরান্ড লাইন হয়তো মানচিত্রের সীমা, কিন্তু বাস্তবে এটি এক অবিশ্বাসের রেখা। এর মাঝেই ঝুলে আছে আফগান–পাকিস্তান সম্পর্ক।


