স্পোর্টস ডেস্ক
ঢাকা: আটলান্টিক মহাসাগরের নীল জলরাশির মাঝে ছড়িয়ে থাকা ছোট্ট এক দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। আয়তনে বাংলাদেশের একটি জেলা নোয়াখালীর চেয়েও ছোট এই দেশটি এখন বিশ্ব ফুটবলের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। একসময় বিশ্ব ফুটবলে প্রায় অচেনা থাকা কেপ ভার্দে নিজেদের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখে জায়গা করে নিয়েছে বড় মঞ্চে। তাদের সাফল্য প্রমাণ করছে, ফুটবলে বড় হতে হলে বিশাল ভূখণ্ড বা বিপুল জনসংখ্যার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন মেধা, পরিকল্পনা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি।
পশ্চিম আফ্রিকার উপকূল থেকে প্রায় ৫৭০ কিলোমিটার দূরে আটলান্টিক মহাসাগরে ১০টি আগ্নেয় দ্বীপ নিয়ে গঠিত কেপ ভার্দে বা কাবু ভের্দি। দেশটির মোট আয়তন প্রায় ৪ হাজার ৩৩ বর্গকিলোমিটার। অন্যদিকে, বাংলাদেশের নোয়াখালী জেলার আয়তন প্রায় ৪ হাজার ২০২ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ, আয়তনের দিক থেকে নোয়াখালীর চেয়েও ছোট এই দেশটি এখন বিশ্বকাপের মঞ্চে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ১৯৭৫ সালে পর্তুগালের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করা দেশটির রাজধানী ‘প্রাইয়া’। দীর্ঘ সময় পর্তুগিজ উপনিবেশ থাকায় এখানকার ভাষা, স্থাপত্য, সংগীত ও সংস্কৃতিতে ইউরোপীয় ও আফ্রিকান প্রভাবের অনন্য মিশ্রণ দেখা যায়।
জনসংখ্যার দিক থেকেও কেপ ভার্দে বিশ্বের অন্যতম ছোট দেশ। ২০২৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ৫ লাখ ৩০ হাজার, যা বিশ্ব জনসংখ্যার মাত্র ০.০০৬ শতাংশেরও কম। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, দেশের অভ্যন্তরীণ জনসংখ্যার চেয়েও বেশি কেপ ভার্দিয়ান বংশোদ্ভূত মানুষ ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে বসবাস করেন। সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ ও ছোট ভূখণ্ডের কারণে নানা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ থাকলেও প্রবাসী আয়, পর্যটন ও সুশাসনের মাধ্যমে দেশটি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে।
কেপ ভার্দের মানুষের কাছে ফুটবল শুধু খেলা নয়, জাতীয় পরিচয়ের অংশ। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়ে তারা নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে। চলতি বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন ও উরুগুয়ের বিপক্ষে ড্র করে চমক দেখায় তারা। এরপর নকআউট পর্বের ‘রাউন্ড অব ৩২’-এ শক্তিশালী আর্জেন্টিনার বিপক্ষে দুর্দান্ত লড়াই করে অতিরিক্ত সময়ে ৩-২ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়। বিশ্লেষকদের মতে, শারীরিক সক্ষমতা, দ্রুতগতির আক্রমণ এবং দলগত ঐক্যই এই দ্বীপরাষ্ট্রের ফুটবলের মূল শক্তি।
আফ্রিকান ঐতিহ্য আর পর্তুগিজ ইতিহাসের মিশেলে তৈরি কেপ ভার্দের সংস্কৃতি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। ‘মর্না’ নামের আবেগঘন সংগীত তাদের ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা বিশ্বখ্যাত গায়িকা সেসারিয়া এভোরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করেছিলেন। এছাড়া সমুদ্রঘেরা দেশ হওয়ায় সামুদ্রিক খাবার তাদের প্রধান পছন্দ। দেশটির জাতীয় ও সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার হলো ‘কাচুপা’—যা ভুট্টা, শিম, সবজি ও মাছ/মাংস দিয়ে তৈরি হয়। পাশাপাশি, দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, আগ্নেয় পাহাড় ও নীল জলের কারণে পর্যটকদের কাছেও এটি স্বর্গরাজ্য। বিশেষ করে ‘সাল’ ও ‘বোয়া ভিস্তা’ দ্বীপে প্রতিবছর হাজারো পর্যটক ভিড় জমান।
বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের উপস্থিতি শুধু একটি ফুটবল দলের সাফল্য নয়, এটি একটি ছোট দেশের আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। তাদের এই অবিশ্বাস্য যাত্রা প্রমাণ করছে, ফুটবলের মাঠে আকার নয়, স্বপ্ন আর লড়াইয়ের মানসিকতাই সবচেয়ে বড় শক্তি।
বাংলাফ্লো/এফআইআর










