আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ঢাকা: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের জেরে বন্দরগুলোতে নতুন করে অবরোধের শঙ্কা তৈরি হওয়ায় গত ২৪ ঘণ্টায় তড়িঘড়ি করে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেলবাহী পাঁচটি সুপারট্যাঙ্কার এবং একটি সুয়েজম্যাক্স জাহাজ সরিয়ে নিয়েছে ইরান। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ব্লুমবার্গ এ খবর জানিয়েছে। ব্লুমবার্গের ট্যাঙ্কার-ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, আজ ইরানের বন্দর ছেড়ে যাওয়া চারটি জাহাজের অবস্থান ওমান উপসাগরে শনাক্ত করা হয়েছে এবং আরেকটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করছিল। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন কেরমানপুরের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী দ্বিতীয় দিনের মতো রেল সেতুর মতো বেসামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানোর পরপরই জাহাজগুলো পাঠানো হয়। মার্কিন হামলায় ১৪ জন নিহত এবং ৭৮ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৪৭ জন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
নতুন করে শুরু হওয়া এই হামলা ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’-কে হুমকির মুখে ফেলেছে, যার ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সামুদ্রিক যান চলাচল সতর্কতামূলকভাবে থমকে গেছে। এসব হামলার ঘটনা জ্বালানির বাজারকেও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। চলতি সপ্তাহে তেলের দাম প্রায় ৯ শতাংশ বেড়ে বৃহস্পতিবার প্রতি ব্যারেল ৭৯ ডলারের কাছাকাছি লেনদেন হয়েছে। এক কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল মূলত যুদ্ধপূর্ববর্তী সময়ে ইরানের প্রায় এক সপ্তাহের রপ্তানির সমান। তবে এই বিপুল পরিমাণ চালানের কোনো ক্রেতা আছে কিনা, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কাতার ও সৌদি আরবে বেশ কয়েকটি জাহাজে ইরানের হামলার পর, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের তেল বিক্রির ওপর দেওয়া সাময়িক নিষেধাজ্ঞা ছাড় বাতিল করে। এর ফলে মঙ্গলবার ইরানের কয়েক কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ থমকে যায়।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) নৌবাহিনী বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, ইরানের ওপর মার্কিন হামলা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের গতিপথ পরিবর্তনের হস্তক্ষেপ প্রণালিটি পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছে। যুক্তরাষ্ট্র আরও হস্তক্ষেপ করলে তার ‘কঠোর জবাব’ দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ার করেছে তারা।
হরমুজ প্রণালি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সবচেয়ে বড় উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, যা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকেও ছাপিয়ে গেছে। জুনে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের আগে জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমি কোনো অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখতে চাইনি।’ সে সময় ট্রাম্পের মন্তব্যে এটি স্পষ্ট হয়েছিল যে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধ এতটাই অর্থনৈতিক ক্ষতি ডেকে আনছিল যে, তার প্রশাসন বাধ্য হয়েই রোববার ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। হোয়াইট হাউস সে সময় জানিয়েছিল যে, এই আলোচনা পরবর্তী দর-কষাকষির মাধ্যমে যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের পথ প্রশস্ত করবে।
সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি ৬০ দিনের জন্য টোলমুক্ত থাকার কথা ছিল। তবে এর ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার সুযোগ রাখা হয়, যা ভবিষ্যতে টোল আরোপের পথ খোলা রাখে এবং এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ওপর অতীতকালের চেয়ে ইরানকে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ দেয়। ওই ব্রিফিংয়ে বলা হয়, ‘প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অন্যান্য পারস্য উপসাগরীয় উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে ভবিষ্যতের প্রশাসন এবং সামুদ্রিক পরিষেবা নির্ধারণ করতে ওমানের সালতানাতের সঙ্গে সংলাপ করবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান।’
এরপর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল বিক্রির ওপর একটি ছাড় দেয়, যা দুই পক্ষের আলোচনায় একটি বড় বিষয় ছিল। এই ছাড়ের ফলে ইরান ২১ আগস্ট পর্যন্ত অপরিশোধিত তেল ও সংশ্লিষ্ট পণ্য উৎপাদন, বিক্রি এবং সরবরাহ করার সুযোগ পেয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের আলোচনার অগ্রগতির সঙ্গে এই নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়টি যুক্ত করেছিল। কিন্তু মঙ্গলবার ইরান প্রণালিতে জাহাজে হামলা চালালে সেই ছাড় বাতিল করা হয়। অতীতেও ট্রাম্প এই সমঝোতা স্মারকের কার্যকারিতা নিয়ে তাচ্ছিল্য প্রকাশ করেছিলেন, যা চলতি সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহেরই পূর্বাভাস ছিল। গত জুনে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘এটি কেবলই একটি সমঝোতা স্মারক। আর যদি আমার এটি পছন্দ না হয়, তবে আমরা আবারও তাদের ওপর গুলি চালানো শুরু করব, তাদের মাথায় বোমা ফেলব।’
বাংলাফ্লো/এফআইআর






