গত ৬ বছর ধরে বসুন্ধরা কিংসের রক্ষণভাগটা সামলে ছিলেন তারিক কাজী। ঘরোয়া ফুটবলের শীর্ষস্থানীয় ক্লাবটির সঙ্গে সম্পর্কচ্ছিন্ন করলেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের এই তারকা ফুটবলার। কারণও জানিয়েছেন তারিক। প্রায় ১ বছর ধরে তারিকের বকেয়া বেতন পরিশোধ করছে না কিংস।
২০২০ সালে ফিনল্যান্ড জীবন ছেড়ে বাংলাদেশে আসেন তারিক। আর তখন থেকেই কিংসের নিয়মিত ডিফেন্ডার তিনি। কিংস ছাড়ার আগে নিজের আক্ষেপ, প্রাপ্তি এবং পাওয়ার না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টা খোলাসা করেন তারিক।
তারিক লিখেছেন, ‘আজ আমি বকেয়া বেতন পরিশোধ না হওয়ার কারণে আইনতভাবে আমার চুক্তি বাতিল করেছি বসুন্ধরা কিংসের সাথে। একজন ফুটবলারের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন চুপ থাকাটা প্রচন্ড বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।’
‘অনিশ্চয়তার এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আমি অনিয়মিত ও বিলম্বিত বেতন পরিশোধের মধ্য দিয়ে গিয়েছি এমন এক সময়, যা আমাকে শুধু একজন পেশাদার হিসেবেই নয়, একজন মানুষ হিসেবেও পরীক্ষা করেছে। এটি শুধু আর্থিক কষ্ট ছিল না; এটি ছিল এক মানসিকচাপ, যা প্রকৃত পেশাদাররা নিঃশব্দে বহন করে। তবুও প্রতিদিন আমি একই ভালোবাসা নিয়ে জেগেছি মাঠে সবকিছু উজাড় করে দিয়েছি, আর অন্তরে লড়েছি এক নীরব যুদ্ধ: ভালোবাসা ও অবিচারের মাঝে।’
কিংসে তার সতীর্থ এবং স্টাফদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তারিক, ‘এই পুরো সময় আমি বেছে নিয়েছি ধৈর্য, পেশাদারিত্ব ও শ্রদ্ধা এমনকি, যখন পরিস্থিতি আমার সহ্যের সীমা ছুঁয়ে গিয়েছিল। আমি বিশ্বস্ত থেকেছি ক্লাবের প্রতীকে, সতীর্থদের প্রতি এবং সেই সমর্থকদের প্রতি যারা সবসময় পাশে থেকেছেন। আমার এ সবকিছুই ছিল ভালোবাসার কারণে ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা, দেশের প্রতি ভালোবাসা, আর সেই মানুষগুলোর প্রতি ভালোবাসা যারা স্টেডিয়াম পূর্ণ করেছে এক বুক আশায় ও হৃদয় দিয়ে। আমার গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই আমার সতীর্থদের, অস্কার ব্রুজন, টিটা ভ্যালেরিউ এবং মারিও গোমেজসহ পুরো টেকনিক্যাল স্টাফকে, যারা নিরলস পরিশ্রম করেছেন, এবং সেই সমর্থকদের, যাদের কণ্ঠ আমাকে শক্তি দিয়েছে যখন সবকিছু অনিশ্চিত মনে হয়েছে।’
বাংলাদেশের জার্সিতে তারিক নিজের ভালোবাসার কথাও উল্লেখ করেন, ‘আমি বাংলাদেশ জাতীয় দলকেও ধন্যবাদ জানাতে চাই। যখনই আমি লাল-সবুজ জার্সি পরে মাঠে নেমেছি, সেটি আমার কাছে ছিল পবিত্র এক অনুভূতি। সেই মুহূর্তগুলোতে আমি সব কষ্ট ভুলে গিয়েছি কারণ বাংলাদেশের হয়ে খেলা আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে, ফুটবল তার আসল রূপে এখনো পবিত্র। বাংলাদেশের ফুটবল একটি নতুন অধ্যায়ের প্রাপ্য এমন এক অধ্যায় যেখানে থাকবে স্বচ্ছতা, সততা ও ন্যায্যতা, প্রতিটি খেলোয়াড়ের জন্য, যারা এই খেলাটির জন্য নিজেদের উৎসর্গ করে। আমি খুব ভালো করেই জানি, দেশে এমন অনেক খেলোয়াড় আছেন যারা আরও কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন পেশাদার খেলোয়াড় যারা এখনো নীরবে কষ্ট পাচ্ছেন, কারণ কিছু ক্লাব নিয়মিতভাবে খেলোয়াড়দের প্রাপ্য বেতন পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়। তাদের সংগ্রামগুলো হয়তো শোনা যায় না, কিন্তু তাদের অবদানই এই খেলাটিকে বাঁচিয়ে রাখে।’
বিদায় নিয়ে তিনি লেখেন, ‘এই বিদায় কোনো রাগ থেকে নয় বরং সত্য, মর্যাদা এবং কৃতজ্ঞতা থেকে। আমি গর্বিত প্রতিটি ঘামের ফোঁটার জন্য, প্রতিটি লড়াইয়ের জন্য, প্রতিটি ট্যাকলের জন্য এবং প্রতিটি মুহূর্তের জন্য যখন আমি বসুন্ধরা কিংসের জার্সি পরে মাঠে নেমেছি গত ছয় বছরে। আমি বসুন্ধরা কিংস ছেড়ে যাচ্ছি গর্ব নিয়ে, কোন কষ্ট নিয়ে নয়। পরিস্থিতি যেমনই হোক, আমার হৃদয় ভরপুর থাকবে সেই বিশেষ মুহূর্তগুলোতে, যা আমি সারাজীবন মনে রাখব! আমার গল্প এখানেই শেষ নয়। এটি কেবল নতুন অধ্যায়ের শুরু। কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধাসহ।’


