স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়-এর স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অধীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ১৯৭৯ সাল থেকে দেশব্যাপী শিশু, কিশোরী এবং সন্তান ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন নারীদের টিকা দ্বারা প্রতিরোধযোগ্য বিভিন্ন সংক্রামক রোগজনিত মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের হার কমিয়ে আনার লক্ষ্যে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
প্রতি বছর প্রায় ৪২ লক্ষ শিশুকে বিভিন্ন প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে টিকা দেওয়া হয় এবং এর মাধ্যমে প্রায় ১ লক্ষ শিশু মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হচ্ছে।
রোববার ১২ অক্টোবর, সকাল ৯ টায় মেপেল লিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, ধানমন্ডিতে বাংলাদেশ সরকারের ইপিআই কর্মসূচির ব্যবস্থাপনায় টাইফয়েড জ্বর প্রতিরোধে টাইফয়েড টিকাদান ক্যাম্পেইন-২০২৫ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাফর, মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং সভাপতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আলী কারাম রেজা, প্রিন্সিপ্যাল, মেপেল লিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, ধানমন্ডি।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- অধ্যাপক ডা. খায়ের আহমেদ চৌধুরী, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর; জনাব মো. জহিরুল ইসলাম, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ঢাকা দক্ষিন সিটি কর্পোরেশন এবং ডা. মো. সুলতান আহম্মদ, পরিচালক, এমসিএইচ সার্ভিস, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, ঢাকা।
টাইফয়েড টিকাদান ক্যাম্পেইন-২০২৫ উপলক্ষে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মোঃ আবু জাফর প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্যে বলেন, এই কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৫ কোটি শিশুকে বিনামূল্যে ১ ভোজ টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন (টিসিভি) প্রদান করা হবে। ক্যাম্পেইনের আওতায় দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত প্রাক-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ বিদ্যালয়ে টিকা পাবে। এছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-বহির্ভূত ৯ মাস থেকে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া হবে কমিউনিটি পর্যায়ে ইপিআই কেন্দ্রে।
ইতোমধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় সহ বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, কওমি মাদ্রাসা, স্কাউট ও গার্লস গাইড এর সাথে সমন্বয়পূর্বক টিকা কার্যক্রমকে সফলভাবে বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও সমাজ কল্যাণ অধিদপ্তর, এনজিও বিষয়ক ব্যুরো এবং বিভিন্ন বেসরকারি এনজিও এর সহযোগিতায় সুবিধাবঞ্চিত শিশু, বেদে পল্লী, চা বাগান, এতিমখানা, শিশু/ কিশোর/কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্র, পথশিশু, যৌনপল্লীতে থাকা শিশুদের তালিকা করে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় টাইফয়েড টিকা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন (টিসিভি) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও) কর্তৃক পরীক্ষিত ও অনুমোদিত (প্রিকোয়ালিফায়েড) একটি নিরাপদ ও কার্যকর টিকা।
এটি প্রোটিন ও শর্করা উভয় উপাদানে গঠিত, ফলে শরীরে দীর্ঘস্থায়ী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে। এই টিকা বাংলাদেশে কোনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে নয় সরকার কেবলমাত্র পরীক্ষিত ও নিরাপদ টিকাই ব্যবহার করে থাকে।
পাকিস্তান, নেপালসহ অনেক দেশ ইতোমধ্যে এই টিকা সফলভাবে প্রয়োগ করেছে। এই টিকা শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে এবং ওষুধ প্রতিরোধী টাইফয়েডের ঝুঁকি হ্রাস করে।
টাইফয়েড টিকা গ্রহণের পর অন্যান্য টিকার মতই সামান্য প্রতিক্রিয়া যেমন টিকাদানের স্থান লালচে হওয়া, সামান্য ব্যাথা, মৃদু জ্বর, ক্লান্তিভাব হতে পারে যা এমনিতেই ভাল হয়ে যায়।
এই টিকায় শরীয়ত নিষিদ্ধ কোন উপকরণ নেই, টাইফয়েড টিকা সৌদি হালাল সেন্টার কর্তৃক হালাল সনদপ্রাপ্ত।
টাইফয়েড টিকাদান ক্যাম্পেইনে টিকা গ্রহণের জন্য উদ্দিষ্ট সকলকে বাক্সাপি ডট গভ ডট বিডি ওয়েবসাইটে ১৭ সংখ্যার জন্মনিবন্ধন তথ্য দিয়ে খুব সহজেই টাইফয়েড টিকার জন্য নিবন্ধন করতে হবে এবং নিবন্ধন কার্যক্রম চলমান আছে।
উল্লেখ্য, এই নিবন্ধন কার্যক্রম ক্যাম্পেইনের শেষ দিন পর্যন্ত করা যাবে। যাদের জন্ম নিবন্ধন সনদ নেই তাদের তালিকা প্রস্তুত করে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় টিকা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হবে।
এই ক্যাম্পেইনে সর্বোচ্চ কাভারেজ নিশ্চিত করার জন্য মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশান এপ্রোচ অনুসরন করা হয়েছে, যাতে সকল শ্রেনীপেশার মানুষ, শিক্ষার্থী, অভিভাবকদের এই টিকা সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে পারে।
সে লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের যোগাযোগ উপকরণ যেমন-পোস্টার, লিফলেট, ফ্যাক্টশিট, এফএকিউএস, ইনফোগ্রাফ, ব্যানার, জিংগেল, টেলিভিশন ও রেডিওতে প্রচারের জন্য অডিও-ভিজ্যুয়াল উপকরণ।
এছাড়াও জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততাকে গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে এডভোকেসি কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য শিক্ষক, ইয়ুথ ভলান্টিয়ার, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, সংবাদকর্মী এবং স্কাউট ও গার্লস গাইড এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় কর্মরত বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থার মাঠ পর্যায়ের কর্মীগণ।
টাইফয়েড টিকা খুবই নিরাপদ। এরপরেও টিকাদান পরবর্তী বিরুপ ঘটনা (এইএফ আই) মোকাবেলার জন্য জেলা/উপজেলা এবং সিটি কর্পোরেশান পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। সকল কমিটির প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে এবং সকল পর্যায়ে এইএফআই কিট বক্স ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে টিকা বিষয়ে ভুল তথ্য বা গুজব প্রচার হতে দেখা যায়। তাই সবাইকে অনুরোধ করছি-অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করুন। প্রয়োজনে সিভিল সার্জন, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বা নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। গুজব প্রতিরোধে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা ও গণমাধ্যম কর্মীদের সহযোগিতা অপরিহার্য। সাংবাদিকবৃন্দের কাছে বিশেষ আহ্বান-আপনারা সঠিক তথ্য প্রচার করুন, যাতে জনগণ টিকা সম্পর্কে আস্থা পায়।
প্রয়োজনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হয়ে আমাদের মনে রাখতে হবে টিকার কারনেই বাংলাদেশ পোলিও মুক্ত হয়েছে, হেপাটাইটিস-বি, হাম, রুবেলা নিয়ন্ত্রনে এসেছে, মা ও শিশুর ধনুষ্টংকার দূরীকরণ হয়েছে, ভবিষ্যতে টিকা দিয়েই টাইফয়েড রোগ নিয়ন্ত্রন এমনকি নির্মূল করা সম্ভব হবে।
টাইফয়েড টিকাদান ক্যাম্পেইন-২০২৫ সফল করতে সকলের আন্তরিক সহযোগিতা প্রয়োজন। এই বিশাল কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে কারিগরি সহায়তার জন্য আমি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফ, বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা সংশ্লিষ্ট সকল সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাকে ধন্যবাদ জানাই।
আসুন, আমরা সবাই মিলে দেশের প্রতিটি শিশুকে টাইফয়েড টিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করি। আমাদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় গড়ে উঠুক একটি সুস্থ, সুরক্ষিত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।


