ব্রাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম বলেন, ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো এলাকায় আগুনে কয়েকজন প্রবাসীর মরদেহ পুড়েছে বলে ফেসবুকে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি পোস্ট চোখে পড়েছে। কয়েকজন এই তথ্যের সত্যতা জানতে চেয়েছেন। বাস্তবে কোন প্রবাসীর মরদেহ পুড়েছে এমন কোন তথ্য অন্তত আমাদের কাছে নেই।
রোববার ১৯ অক্টোবর, ব্রাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলামের ভেরিফাইড ফেসবুক পোস্টে তিনি এসব কথা বলেন।
শরিফুল ইসলাম তার বিবৃতিতে লেখেন, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আমরা সিভিল এভিয়েশন, এভসেক, এপিবিএন, প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক, ইমিগ্রেশন পুলিশসহ নানা কর্তৃপক্ষের সাথে যৌথভাবে কাজ করি। কোন প্রবাসীর মরদেহ পোড়ার ঘটনা কেউ জানে বলে আমাদের জানা নেই।
ওমানে সড়ক দুর্ঘটনা বিষয়ে তিনি বলেন, ওমানে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত আট প্রবাসীর লাশ গতকাল শনিবার দেশে এসেছে এটি সত্যি। তবে ওই লাশগুলো এসেছে চট্টগ্রামে। রাত সাড়ে ১০টায় বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে তাদের মরদেহ চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। এরপর লাশগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তাদের মধ্যে ৭ জনকে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে ও একজনকে রাউজানে গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়েছে। আজ রোববার সকালে সন্দ্বীপ ও রাউজানে নিহতদের দাফন সম্পন্ন করা হয়।
তিনি আরও বলেন, এটি সত্যি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাধারণত প্রবাসীদের যে লাশ আসে, সেই লাশবাহী কফিনগুলো কার্গোর এপ্রোন এরিয়ায় মালামালে ভিড়ে সাধারণত খোলা আকাশের নিচে অযত্নে পড়ে থাকে। ভাগ্যিস গতকাল কোন কফিন ছিলো না। থাকলে মালামালের সাথে লাশগুলো পুড়ে যেতে পারতো। কাজেই ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক থাকতে হবে।
উলেখ্য, প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫ জন প্রবাসীর লাশ কফিনবন্দি হয়ে ফেরে। দিনের বেলায় কফিনবন্দি প্রবাসীদের লাশগুলো কার্গোর মালামালের সাথে প্রচন্ডরকম ধাক্কাধাক্কি করে স্বজনদের নিতে হয়। যাদের ওয়ারিশ আসতে দেরি হয়, তাদেরকে এমন একটা কোল্ড স্টোরেজে রাখা হয় তার চেহারা দেখলে জীবিতদের কাছে বিভৎস লাগবে৷ যারা লাশ নিতে আসেন সেই স্বজনদের অপেক্ষার খুব ভালো কোন জায়গা নেই।
শরিফুল ইসলাম প্রবাসীদের লাশগুলোর সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে বলেন, ওই সময়ের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের সহকারী পরিচালক ফখরুল, খুব মর্মবেদনা নিয়ে আমাকে এই সেবার দুরাবস্থার কথা বলেছিলেন। এখন যিনি দায়িত্বে তিনিও বলেন। প্রবাসীদের এই লাশগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তরের সেবার মান বৃদ্ধির জন্য ২০২৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমি এই সময়ের প্রবাসী কল্যাণ সচিবের কাছে একটি চিঠি লিখি। সেখানে স্বজনদের অপেক্ষার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট জায়গা নির্ধারণসহ আরো কিছু ব্যবস্থাপনা ভালো করার অনুরোধ জানাই। ওই সময়ের সিভিল এভিয়েশনের পরিচালক প্রশাসনের সাথেও কথা বলি জায়গা বরাদ্দ নিয়ে। তিনিও বেশ আন্তরিক ছিলেন। ওই চিঠির পর ছোট্ট একটা জায়গা স্বজনদের বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে পুরো ব্যবস্থাপনা আরো ভালো করার সুযোগ রয়েছে। আমি সচিবকে দেওয়া ওই চিঠিটা কমেন্টে দিচ্ছি। চিঠিটা পড়লেই বুঝবেন প্রবাসীদের মরদেহ হস্তান্তর প্রক্রিয়া কত দুর্ভোগের!

তিনি আরও বলেন, অসংখ্যবার বলি প্রবাসীরা এই দেশের অর্থনীতির ভিত্তি। সেই প্রবাসীদের অনেকে বিদেশে কাজ করতে গিয়ে মর্মান্তিকভাবে মৃত্যু বরণ করেন। প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫ জন প্রবাসীর লাশ কফিনবন্দি হয়ে ফেরে এবং বছর চার হাজারের বেশি লাশ প্রতিবছর ফেরে। গত ১৬ বছরে অন্তত ৫০ হাজার প্রবাসীর লাশ ফিরেছে। একাধিকবার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করে এই রাষ্ট্রকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছি অধিকাংশ প্রবাসী মধ্যবয়সে অস্বাভাবিকভাবে ব্রেইন স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। এই বিষয়ে নজর দেওয়া জরুরি। অসংখ্যবার আমি ঐ বিষয় নিয়ে কথা বলেছি।
রাষ্ট্রের কাছে আশা করবো অন্তত মরদেহগুলো কফিনে বন্দি হয়ে দেশে আসার পর কার্গোর মালামালের সাথে ফেলে না রেখে সুনির্দিষ্ট একটা জায়গা করুন। অন্তত এই আগুনের ঘটনার পর এটি জরুরী। আর যারা লাশ নিতে আসেন তাদের বসার জন্য আরেকটু ভালো জায়গা করুন।
লাশ হস্তান্তর নিয়ে শরিফুল ইসলাম বলেন, দাফনের টাকাসহ পুরো প্রক্রিয়াটি ওয়ান স্টপ সেন্টার করুন। বেঁচে থাকতে না হয় সম্মান দেননি, মৃত এই প্রবাসীদের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর প্রক্রিয়া আরেকটু দুর্ভোগমুক্ত করুন। কারণ পরিবার আর এই দেশের জন্য আয় রোজগার করতে গিয়েই তারা মরেছে। কাজেই তাদের যোগ্য সম্মান দিন। আশা করছি রাষ্ট্র মানবিকভাবে বিবেচনা করবে।


