জুলাই সনদ বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে বলে আশা করা হলেও
এর বাস্তবায়ন কৌশল ও সময়সীমা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে মতভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আগামী ১৭ অক্টোবর ঐকমত্য কমিশন প্রণীত এই সনদে স্বাক্ষরের কথা থাকলেও, শুধুমাত্র ৩১টি দলের সহমতকে ‘জাতীয় ঐকমত্য’ বলা যায় কি না তা নিয়ে বিতর্ক তীব্র হয়েছে।
গতকাল বুধবার (১৫ অক্টোবর) রাজধানীতে জনতা পার্টি বাংলাদেশের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা এসব প্রশ্ন উত্থাপন করেন। সভার সভাপতিত্ব করেন জনতা পার্টি বাংলাদেশের নির্বাহী চেয়ারম্যান গোলাম সারোয়ার মিলন। প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ মুসলীম লীগের সভাপতি এড. মহসীন রশিদ।
এড. মহসীন রশিদ বলেন, জুলাইয়ের সফল গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সরকারের বৈধতা নিয়েও ভবিষ্যতে প্রশ্ন উঠতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, একসময় ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার যেভাবে পঞ্চদশ সংশোধনী করে জনগণের ধিক্কারের মুখে পড়েছিল, তেমনি ইউনুস সরকারও সীমিত কিছু দলকে সঙ্গে নিয়ে জুলাই সনদ প্রণয়ন করে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করছে।
তার ভাষায়, অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতার জন্য শুধুমাত্র জুলাই সনদ গ্রহণ করাকে জাতি মেনে নেবে না। বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য ছাড়া এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে জনরোষ ডেকে আনতে পারে।
সভায় সভাপতির বক্তব্যে গোলাম সারোয়ার মিলন বলেন, ৭১ ও ২৪-এর চেতনায় জুলাই সনদ প্রণয়নের উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার বদলে বিভক্ত করেছে।
তিনি বলেন, যে সনদে জাতীয় রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক বা নিষ্ক্রিয় দলগুলোকে মুখ্য করা হয়, অথচ নিবন্ধিত ও বিপ্লব-সমর্থক দলগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হয়— তা কখনো জাতীয় ঐকমত্যের দলিল হতে পারে না।
সভায় গৃহীত এক প্রস্তাবে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার তীব্র সমালোচনা করা হয়। বক্তারা অভিযোগ করেন, কমিশন এখন নিজেই স্বীকার করছে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে ত্রুটি ও গাফিলতি হয়েছে।
তারা আরও বলেন, কমিশন এক-এগারোর বা ফ্যাসিস্ট আমলের নীতিমালা অনুসরণ করছে, অথচ বর্তমান কমিশন গঠিত হয়েছে জুলাই বিপ্লবের ফলশ্রুতিতে। বক্তারা প্রশ্ন তোলেন, এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন আদৌ অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে কি?
বিএনপি ও জামায়াতের পক্ষ থেকেও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ তোলার বিষয়টি সভায় আলোচনায় আসে।
সভায় গৃহীত আরেক প্রস্তাবে বলা হয়, ফ্যাসিস্ট আমলে গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের পদক্ষেপ ইতিবাচক হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেনাবাহিনী সম্পর্কে বিদ্বেষমূলক অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। বক্তারা এটিকে জাতীয় নির্বাচনের আগে সেনাবাহিনীর মনোবলে আঘাতের ষড়যন্ত্র” হিসেবে আখ্যা দেন।
প্রস্তাবে বলা হয়, দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর সহযোগিতা ছাড়া স্বৈরাচারের বিদায় সম্ভব ছিল না। ৫ আগস্ট সেনাপ্রধানের ডাকে সব রাজনৈতিক নেতার সাড়া দেওয়াই তার প্রমাণ।
বক্তারা ইউনুস সরকারের প্রতি আহ্বান জানান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অপপ্রচারে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে।
এনপিপির চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন সালু ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকগুলোতে কোন দল কী ভূমিকা রেখেছে, তার পূর্ণাঙ্গ কার্যবিবরণী ও আপ্যায়ন ব্যয় প্রকাশের দাবি জানান।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলামের নির্বাহী চেয়ারম্যান মাওলানা আশরাফুল হক অভিযোগ করেন, নিবন্ধনের নামে অন্তর্বর্তী সরকার সমর্থক ও অর্থবান দলগুলোকে ফেভার করা হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, কমিশনের ডাকা বেশিরভাগ দলই ভারতপন্থী।
বাংলাদেশ মুসলীম লীগের মহাসচিব কাজী আবুল খায়ের বলেন, জুলাই সনদ প্রণয়নের জন্য কতগুলি নিবন্ধিত দলকে ডাকা হয়েছিল? যদি জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিফলিত না হয়, তবে ইউনুস সরকারকে একদিন এর জবাব দিতে হবে।
অবসরপ্রাপ্ত মেজর আফসারী বলেন, রাজনীতিতে একটি নতুন শক্তির আবির্ভাব এখন সময়ের দাবি।
সভায় মিরপুরে অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের রুহের মাগফেরাত কামনা এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করা হয়। পাশাপাশি চলমান শিক্ষক আন্দোলনের যৌক্তিক দাবি দ্রুত মেনে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
সভায় উপস্থিত ছিলেন, জনতা পার্টি বাংলাদেশের মহাসচিব শওকত মাহমুদ, উপদেষ্টা ড. ফোরকান উদ্দিন আহমেদ, ভাইস চেয়ারম্যান রফিকুল হক হাফিজ, এড. এবিএম ওয়ালিউর রহমান খান, এড. মোঃ আব্দুল্লাহ, এম এ ইউসুফ, জাগপার সভাপতি মহিউদ্দিন বাবলু, সাধারণ সম্পাদক এড. মজিবুর রহমান, এনপিপির সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য মোঃ আব্দুল হাই মন্ডল, বাংলাদেশ ঐক্য পার্টির সাধারণ সম্পাদক আঃ রহিম চৌধুরী, জনতা পার্টি বাংলাদেশের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মোঃ আসাদুজ্জামান, যুগ্ম মহাসচিব রফিকুল হক তালুকদার রাজা প্রমুখ।
সভায় দেশপ্রেমিক, আধিপত্যবাদবিরোধী ও মধ্যপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সমন্বয়ে একটি নতুন জোট গঠনের সম্ভাবনাও আলোচিত হয়।


