জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিভাজন দেখা দিয়েছে। সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া, নোট অব ডিসেন্ট উপেক্ষা এবং আইনি ভিত্তি নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। কেউ বলছেন, সনদের নামে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে-জণগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। কেউ বলছেন, ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশই সঠিক দিকনির্দেশনা।
জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর অভিযোগ করেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের নামে রাজনৈতিকভাবে বৈষম্য ও বিভাজন তৈরি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “ড. ইউনূস তিনটি দলকে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে রেখে ছোট দলগুলোর সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। ছাত্রসমাজকেও দূরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।” নুর অভিযোগ করেছেন, ‘ডিজিটাল মবের চাপে এখন সঠিকভাবে কথা বলাও কঠিন হয়ে পড়েছে।’
একই অনুষ্ঠানে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, নির্বাচিত সরকার বৈধতা না দিলে জুলাই সনদ বৈধতা পাবে না। তিনি অভিযোগ করেন, ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে নোট অব ডিসেন্ট অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, যা কমিশনের প্রতি আস্থায় আঘাত হেনেছে। সাকি বলেন, “যদি কারও ওপর কিছু চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে রাজনৈতিক সংকটের আশঙ্কা তৈরি হবে।”
তিনি আরও বলেন, এখন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আলাদা সময়ের ব্যবধান রেখে আয়োজনের সুযোগ নেই; বিলম্ব হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জানিয়েছে, তাদের আপসহীন অবস্থানের কারণে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদের বাস্তবায়ন রূপরেখা সরকারের কাছে পেশ করতে বাধ্য হয়েছে।
বুধবার এক বিবৃতিতে এনসিপি উল্লেখ করেছে, জুলাই সনদ কেবল রাজনৈতিক দলিল নয়; এটি বাস্তবায়নের জন্য আইনি ভিত্তি থাকা আবশ্যক। কমিশনের প্রস্তাবিত প্রথম খসড়া (প্রস্তাব–১) বাস্তবায়নের উপযোগী বলে দলটি মনে করছে। এতে সংবিধান সংস্কার বিলের বাধ্যতামূলক অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে, যা গণভোটের ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে অত্যাবশ্যক।
এনসিপি দাবি করেছে, সরকারকে বিলম্ব না করে এই প্রস্তাব গ্রহণ করতে হবে এবং ভাষাগত অস্পষ্টতা দূর করতে হবে।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে নোট অব ডিসেন্ট সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। তিনি এটিকে জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে “একটি প্রতারণা” হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন, “এটা ঐক্য নয়, এটা প্রতারণা। কমিশন কেন করা হয়েছিল, সেটাই প্রশ্ন।”
তিনি আরও জানান, জুলাই আন্দোলনের ত্যাগ ও আত্মবলিদান জাতির কল্যাণে কাজে লাগানো যাচ্ছে না; বরং রাজনৈতিক বিভক্তি দিন দিন গভীর হচ্ছে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার বলেন, জুলাইয়ে যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগ ব্যর্থ হবে যদি গণভোটে জুলাই সনদ পাস না হয়। তিনি বলেন, “আমরা রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছি। জুলাই সনদ যেন ব্যর্থ না হয়, এটি পাস করানো আমাদের সবার দায়িত্ব।”
ছাত্র সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের গণভোটে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে আহ্বান জানান বদিউল আলম মজুমদার।
জামায়াতে ইসলামী মনে করে, জাতীয় নির্বাচন সময়মতো না হলেও গণভোট আগে হওয়া উচিত।
দলটির নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বলেন, “জুলাই সনদ ও জাতীয় নির্বাচন একসঙ্গে করলে সনদ অনিশ্চয়তার দিকে যাবে। আগে গণভোট, পরে নির্বাচন হওয়াই যুক্তিযুক্ত।”
তিনি আশা প্রকাশ করেন, নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে গণভোটের তারিখ ঘোষণা হলে মাসের শেষ দিকে ভোটগ্রহণ সম্ভব হবে।


