দীর্ঘদিন অন্ধত্বে ভোগা একদল মানুষ আবারও পড়তে পারছেন বই ও সংবাদপত্র। যুক্তরাজ্যের লন্ডনের বিখ্যাত মুরফিল্ডস আই হাসপাতালের চিকিৎসকরা চোখের পেছনে বসানো এক ক্ষুদ্র ইমপ্লান্টের মাধ্যমে এই যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছেন। আর এই প্রযুক্তির ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অংশ নিয়েছেন একজন বাংলাদেশি।
সোমবার (২০ অক্তনর) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দ্য টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক সায়েন্স কর্পোরেশনের উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তির ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে চিকিৎসক হিসেবে অংশ নিয়েছেন যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত মুরফিল্ডস আই হাসপাতালের সিনিয়র ভিট্রিওরেটিনাল কনসালট্যান্ট ড. মাহিউল মুকিত খান, যিনি এনআরবি ব্যাংকের অন্যতম স্পনসর শেয়ারহোল্ডার ও সাবেক পরিচালক হিসেবেও পরিচিত।
কীভাবে কাজ করে এই প্রযুক্তি
প্রাইমা ইমপ্লান্ট নামে পরিচিত এই প্রযুক্তিটি বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে চোখের রোগ ড্রাই এজ-রিলেটেড ম্যাকুলার ডিজেনারেশন-এর উন্নত পর্যায় জিওগ্রাফিক অ্যাট্রোফি-তে আক্রান্ত রোগীদের জন্য। যুক্তরাজ্যে এই রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা আড়াই লক্ষাধিক এবং বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ এতে ভুগছেন। চোখের রেটিনার ক্ষতিগ্রস্ত কোষের নিচে মাত্র ২ মিলিমিটার বর্গাকার এক আলোকসংবেদী (ফোটোভোল্টায়িক) মাইক্রোচিপ প্রতিস্থাপন করা হয়। এর পুরুত্ব মানুষের চুলের সমান। রোগীরা পরে বিশেষ চশমা ব্যবহার করেন যার সঙ্গে থাকে একটি ভিডিও ক্যামেরা। এই ক্যামেরা ভিডিওচিত্রকে ইনফ্রারেড রশ্মির মাধ্যমে ইমপ্লান্টে পাঠায়, যা পরে ছোট একটি প্রসেসরে গিয়ে স্পষ্ট চিত্রে রূপান্তরিত হয়। ইমপ্লান্ট সেই চিত্র মস্তিষ্কে পাঠায় অপটিক নার্ভের মাধ্যমে—ফলে রোগী আংশিক দৃষ্টিশক্তি ফিরে পান।
দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাচ্ছেন দৃষ্টিহীনরা
ড. মাহিউল মুকিত খান বলেন, দৃষ্টিহীনরা পড়া, লেখা বা মুখ চিনতে সক্ষম ছিলেন না। এখন তারা আবার আলো দেখতে পাচ্ছেন। কৃত্রিম দৃষ্টিশক্তির ইতিহাসে এটি এক নতুন অধ্যায়—অন্ধ রোগীরা এখন কার্যকরভাবে দৃষ্টি ফিরে পাচ্ছেন।
লন্ডনের শিলা আরভিন নামের এক অংশগ্রহণকারী বলেন, অপারেশনের আগে আমার চোখের সামনে দুটি কালো বৃত্ত দেখতাম, কিছুই পড়তে পারতাম না। কিন্তু এখন আমি অক্ষর চিনতে পারি—এ যেন জীবনের নতুন শুরু।
এই ট্রায়ালে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও নেদারল্যান্ডসের ৩৮ জন বয়সজনিত ম্যাকুলার ডিজেনারেশন আক্রান্ত রোগী অংশ নেন। এক বছর ব্যবহারের পর দেখা যায়, ৮০ শতাংশেরও বেশি রোগীর দৃষ্টিশক্তিতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে—গড়পড়তা ২৫ অক্ষর বা পাঁচ লাইন পর্যন্ত পড়ার সক্ষমতা ফিরে এসেছে।
জীবন বদলে দেওয়ার প্রযুক্তি
প্রযুক্তিটি উদ্ভাবন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ভিত্তিক সায়েন্স কর্পোরেশন, যাদের প্রধান নির্বাহী ম্যাক্স হোডাক বলেন, প্রাইমা ইমপ্লান্ট দৃষ্টিহীনদের জীবনে নতুন আশার আলো এনেছে। এটি ভবিষ্যতে দৃষ্টি পুনরুদ্ধারের ধারণাকেই বদলে দেবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একসময় যারা পুরোপুরি দৃষ্টি হারিয়ে ফেলেছিলেন, এই প্রযুক্তি তাদের জন্য কার্যকর সমাধান হতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে এবং ভবিষ্যতে প্রযুক্তিটি যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস-এর আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে।
নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত গবেষণাটির প্রধান লেখক ড. ফ্রাংক হোলৎস বলেন, এই গবেষণার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো আমরা জিওগ্রাফিক অ্যাট্রোফিতে আক্রান্ত রোগীদের কার্যকর কেন্দ্রীয় দৃষ্টি ফিরিয়ে আনতে পেরেছি। এটি দৃষ্টিহীনতা নিরাময়ের ধারণায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা
এই প্রযুক্তি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে এবং বাজারে অনুমোদন পায়নি। তবে ড. মুকিত আশাবাদী যে, কয়েক বছরের মধ্যে এটি এনএইচএস (যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা)-এর রোগীদের জন্যও পাওয়া যাবে।
ম্যাকুলার সোসাইটির গবেষণা পরিচালক ড. পিটার ব্লুমফিল্ড বলেন, এটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। যারা এতদিন কোনো চিকিৎসা বিকল্প পাননি, তাদের জন্য এটি এক নতুন আশার আলো।
এই গবেষণা শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন দিগন্তই উন্মোচন করেনি, বরং দৃষ্টিহীন মানুষের জীবনে আলো ফেরানোর এক বাস্তব সম্ভাবনাও তৈরি করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, যাদের চোখের অপটিক নার্ভ সম্পূর্ণ অকার্যকর, তাদের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি কার্যকর হবে না।


