‘ঘুম থেকে উঠে মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে প্রথমেই আপনি কী করেন?’- এই প্রশ্নের উত্তরে বেশিরভাগ মানুষই হয়তো বলবেন, ‘ফেসবুক নোটিফিকেশন চেক করি।’ নয়তো কেউ বলবেন, ‘হোয়াসঅ্যাপ বা ইনস্টাগ্রাম চেক করি।’ তারমানে হচ্ছে বেশিরভাগ মানুষ এখন আটকে আছেন মেটা নেটওয়ার্কে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে প্রতিদিন ৩.৫ বিলিয়ন সক্রিয় ব্যবহারকারী রয়েছে এই মেটা নেটওয়ার্কের (ফেসবুক-হোয়াসঅ্যাপ-ইনস্টাগ্রাম)।
এই মেটা নেটওয়ার্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দুনিয়ায় আবারও বড় পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে। ২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে মেটার নতুন এআই (Artificial Intelligence) গোপনীয়তা নীতি। এই নীতি নিয়ে আসবে সামাজিক মাধ্যমে বিরাট পরিবর্তন।
বিভিন্ন প্রযুক্তি সাইটের সূত্রে জানা গেছে এই নীতির মূল লক্ষ্য হলো, ব্যবহারকারীর সঙ্গে এআই চ্যাটবটের আলাপচারিতা থেকে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করে আরও লক্ষ্যভিত্তিক ও ব্যক্তিগতকৃত (personalized) বিজ্ঞাপন তৈরি করা।
একটু উদাহরণ দিলে বিষয়টি ভালো করে বুঝতে পারবেন, ধরুন আপনি মেটার এআই বটের সঙ্গে “ঢাকার সেরা রেস্টুরেন্ট”, “শিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়া”, কিংবা “ফিটনেস টিপস” নিয়ে কথা বললেন।সেই আলাপচারিতা থেকে মেটা নেটওয়ার্ক বুঝে যাবে আপনার আগ্রহের বিষয়গুলো। এরপর আপনি যখনই ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে আসবেন, দেখবেন আপনার ফিডে রেস্টুরেন্ট, স্টাডি অ্যাব্রড বা ফিটনেস পণ্যের বিজ্ঞাপন আসতে শুরু করেছে।
অনেকে হয়তো বলবেন, এরকমতো আগেই ছিল বা এখনও আছে, তা অনেকটা ঠিক হলেও সামনের দিনগুলিতে এর ব্যপকতা আরও বাড়বে।

বিজ্ঞাপনের নতুন যুগ: এআই কথোপকথনই হবে সূত্র
নীতিমালার ঘোষণা দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে মেটা বলেছে, তাদের লক্ষ্য হলো বিজ্ঞাপনকে আরও প্রাসঙ্গিক ও কার্যকর করে তোলা। আগে যেখানে ব্যবহারকারীর লাইক, ফলো, বা পোস্টের তথ্যের ভিত্তিতে বিজ্ঞাপন দেখানো হতো, এখন সেখানে যুক্ত হচ্ছে এআই চ্যাটবট কথোপকথনের ডেটা।
নতুন নীতিমালা কার্যকর হবার পরে যদি ইনস্টাগ্রামে/ফেসবুকে মেটা এআইকে জিজ্ঞাসা করেন “সাশ্রয়ী মূল্যে ইউরোপ ভ্রমণের উপায় কী?”, মেটা ধরে নেবে আপনি ভ্রমণে আগ্রহী এবং এর পরদিনই হয়তো আপনি “Travel Europe with low budget” ধরনের বিজ্ঞাপন দেখতে পারেন।

এভাবে মেটা ব্যবহারকারীর আগ্রহ বোঝার জন্য নতুন ‘অ্যাড সিগন্যাল’ তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে তাদের আয় বাড়ানোর বড় উৎস হতে পারে।
নতুন ফিচার ও পরিকল্পনা
নতুন নীতির সঙ্গে কিছু নতুন ফিচারও যোগ হচ্ছে—
Meta AI Everywhere: এখন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারে সরাসরি মেটা এআই-কে প্রশ্ন করা যাবে, যেমন ChatGPT-এর মতো।
AI Editing Tools: ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে নতুন ফটো ও ভিডিও এডিটিং টুল যুক্ত হচ্ছে, যেখানে ব্যবহারকারীরা ছবির পটভূমি বদলাতে, ক্যাপশন সাজাতে বা থিম তৈরি করতে পারবেন এআই দিয়ে।
Smart Recommendation Engine: আপনার আগ্রহ ও কথোপকথনের ধরন অনুযায়ী নিউজফিড ও রিলসে কনটেন্ট সাজানো হবে।
AI Persona বা ভার্চুয়াল চরিত্র: কিছু দেশে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহারকারীরা নিজেদের মতো এআই পারসোনা তৈরি করতে পারবেন, যা বন্ধু বা ফলোয়ারদের সঙ্গে কথোপকথনে অংশ নিতে পারবে।
মনিটাইজেশনের পথ: মেটার আয় বাড়ানোর নতুন দিক
এআই-ভিত্তিক নীতির সবচেয়ে বড় দিক হলো অর্থোপার্জন বা মনিটাইজেশন। মেটা আশা করছে, বিজ্ঞাপনদাতারা আরও লক্ষ্যভিত্তিক বিজ্ঞাপনের সুযোগ পেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করবে।
একইসঙ্গে মেটা ভবিষ্যতে “AI Business Suite” চালু করতে পারে, যেখানে ব্যবসায়ীরা তাদের এআই চ্যাট ব্যবহার করে গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলতে পারবে এবং সেই তথ্য বিজ্ঞাপন পরিকল্পনায় কাজে লাগাতে পারবে। এটি ছোট ব্যবসা ও অনলাইন বিক্রেতাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে।

ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা নিয়ে বিতর্ক
তবে সমালোচনার জায়গাও কম নয়। অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, এভাবে এআই কথোপকথনকে বিজ্ঞাপনের জন্য ব্যবহার করা মানে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য আরও গভীরে বিশ্লেষণ করা।
মেটা অবশ্য জানিয়েছে, সংবেদনশীল বিষয়—যেমন ধর্ম, রাজনীতি, স্বাস্থ্য, বা যৌনতা—সম্পর্কিত কথোপকথন কখনোই বিজ্ঞাপনের জন্য ব্যবহার করা হবে না। আবার, ব্যবহারকারীরা চাইলে কিছু সীমিত পর্যায়ে তাদের তথ্য ব্যবহারের অনুমতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, কিন্তু পুরোপুরি বন্ধ করার (opt-out) সুযোগ থাকবে না।
বাংলাদেশের ব্যবহারকারীদের জন্য কী মানে
বাংলাদেশে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের বিশাল ব্যবহারকারী রয়েছে, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসা ও অনলাইন উদ্যোক্তারা তাদের বিক্রয়ের বড় অংশ সামাজিক মাধ্যমে করে থাকেন।
এই নীতি কার্যকর হলে তাদের জন্য বিজ্ঞাপন আরও কার্যকর হতে পারে, কারণ গ্রাহকের আগ্রহ আরও ভালোভাবে চিহ্নিত করা যাবে। যেমন, কেউ যদি “ঢাকায় কোচিং সেন্টার” বা “সিরাজগঞ্জে রিসোর্ট” নিয়ে এআইকে প্রশ্ন করে, তাহলে স্থানীয় ব্যবসাগুলোর বিজ্ঞাপন ঐ ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা বাড়বে।
তবে একইসঙ্গে গোপনীয়তা রক্ষার প্রশ্নে সচেতনতা বাড়াতে হবে, কারণ অনেক ব্যবহারকারী হয়তো বুঝতেই পারবেন না যে তাদের কথোপকথনও এখন বিজ্ঞাপন নীতির অংশ হয়ে গেছে।
মেটার নতুন এআই নীতি মূলত দুটি উদ্দেশ্য নিয়েই এসেছে — একদিকে ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা উন্নত করা, অন্যদিকে বিজ্ঞাপন থেকে আয় বাড়ানো। এআই প্রযুক্তি এখন শুধু প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে না, বরং ব্যবহারকারীর আচরণ, আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বুঝে ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি করছে।
তবে এটি প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত খুললেও প্রাইভেসি ও ডেটা সিকিউরিটি প্রশ্নে বিশ্বজুড়ে নতুন বিতর্কও জন্ম দিচ্ছে। বিশ্বজুড়ে প্রাইভেসি ও ডেটা সিকিউরিটি একটি বিরাট বিষয় হলেও বাংলাদেশের ব্যবহারকারীরা অনেকটাই বেখেয়াল এসব বিষয়ে, রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’, ‘ব্যক্তিগত ডাটা সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫’ এবং ‘জাতীয় উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫’ তৈরি হলেও এগুলো বাস্তবজীবনে কীভাবে কার্যকর হয় এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন প্লাটফর্মের সঙ্গে কীভাবে তাল মিলিয়ে নাগরিক সুরক্ষা দেবে, তা বুঝতে আরও অপেক্ষা করতে হবে।


