হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ঔষধ উৎপাদনে ব্যবহৃত প্রায় ২০০ কোটি টাকার বিভিন্ন কাঁচামাল পুড়ে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এই ক্ষয়ক্ষতির জেরে ঔষধ শিল্পখাতের প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার ওপর অর্থনৈতিক প্রভাব পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে ।
মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর তেজগাঁও-গুলশান লিংক রোডে অবস্থিত বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ একথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির পক্ষ থেকে ঔষধ শিল্পের বর্তমান সংকট উত্তরণে মোট ১৪টি দাবি উত্থাপন করা হয়। সমিতির পক্ষ থেকে ডিজিডিএ, নারকোটিকস, কাস্টমস, এনবিআর ও বিমান কর্তৃপক্ষসহ অন্যান্য রেগুলেটরি বোর্ডকে নিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি যৌক্তিক সভা ডেকে এই খাতের সব সমস্যা সমাধানে সুষ্ঠু পদক্ষেপ গ্রহণ করার আহবান জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উত্থাপন করেন বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির মহাসচিব এবং ডেল্টা ফার্মার ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডা. মো. জাকির হোসেন। শুরুতে সূচনা বক্তব্য দেন সমিতির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ইউনিমেড ইউনিহেলথর চেয়ারম্যান এম মোসাদ্দেক হোসেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, দেশের ঔষধ শিল্পে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের কাঁচামালের প্রায় ৯০% শতাংশ চায়না, ভারত এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানী করা হয়। এ ছাড়াও এই শিল্পখাতে ব্যবহৃত প্যাকিং ম্যাটেরিয়ালস্, ক্যাপিট্যাল মেশিনারি, স্পেয়ারপার্টস—এগুলোও আমদানী করতে হয়।
আমদানীকৃত কাঁচামালের বড় অংশ বিভিন্ন ধরনের জীবনরক্ষাকারী ঔষধ প্রস্ততে ব্যবহার করা হয়। আমদানীকৃত জরুরি এসব কাঁচামাল বরাবরই আকাশপথে আনা হয়। ফলে এই ক্ষতি এক ধরনের সংকট তৈরি করবে।
সংবাদ সম্মেলনের বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশে বর্তমানে ৩০৭টি ঔষধ প্রস্তত কোম্পানি আছে, এর মধ্যে বর্তমানে ২৫০টি প্রতিষ্ঠান সক্রিয়ভাবে ঔষধ উৎপাদন করে থাকে। গত ১৮ অক্টোবর কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার ৪৫টি ঔষধ কোম্পানির প্রায় ২০০ কোটি টাকার কাঁচামাল পুড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে । বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো আরও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দিলে মোট ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়, পুড়ে যাওয়া পণ্যের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক, ভ্যাকসিন, হরমোন, ডায়াবেটিক, ক্যান্সার জাতীয় ঔষধ উৎপাদনে প্রয়োজনীয় কাঁচামালসমূহও ছিল। এসব কাঁচামাল পুড়ে যাওয়ার কারণে উল্লিখিত ঔষধ উৎপাদন যেমন ব্যহত হবে, তেমনিভাবে বেশ কিছু স্পেয়ার পার্টস ও মেশিনারিজ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, যা ঔষধ প্রস্ততকরণে পুনরায় আমদানীও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। ফলে এর সাথে সংযুক্ত উৎপাদন প্রক্রিয়াগুলোও ব্যহত হবে।
এদিকে যে সব পণ্য অন্যান্য এয়ারপোর্টে নামানো হয়েছে, সেসব পণ্য নিয়েও ঔষুধ কোম্পানিগুলোকে চিন্তিত করছে। কেননা সে সব কাঁচামাল বিশেষ তাপমাত্রায় রাখতে হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, পুড়ে যাওয়া পণ্যের যে হিসাব এসেছে, এটি আরও বাড়বে। আবার এই পণ্য প্রতিটি ফিনিসড প্রোডাক্টের জন্য প্রযোজ্য। ফলে একটি র-ম্যাটিরিয়ালের কারণে একটি ফিনিসড প্রোডাক্ট উৎপাদন—পুরোটাই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে। স্বভাবতই প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার ওপর এটির অর্থনৈতিক প্রভাব পড়বে।
সম্মেলনে মোট ১৪টি বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ উল্লেখ করা হয়েছে, বিশেষ নজর ও সঠিক দিক-নির্দেশনার প্রত্যাশা করা হয়। বিষয়গুলো হলো-
১. আগুনে পুড়ে যাওয়া যেসব পণ্যের শুল্ক, ডিউটি ট্যাক্স ও ভ্যাট এরইমধ্যে দেওয়া হয়েছে তা আমদানিকারকদের ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা।
২. পুড়ে যাওয়া পণ্যের এলসি সংক্রান্ত সব ব্যাংক চার্জ, সুদ মওকুফ করা।
৩. ক্ষতিগ্রস্ত মালামাল পুনঃআমদানির ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো যেন কোনো মার্জিন, ব্যাংক চার্জ অথবা সুদ দাবি না করে; সহজ শর্তে এলসি খোলা এবং এলসি রিলিজের সুযোগ দেয়।
৪. অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত মালামালের বিল অফ অ্যান্ট্রির বিপরীতে চার্জ মওকুফ করা।
৫. বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের আরোপযোগ্য সব চার্জ-দণ্ড মওকুফ করা।
৬. যেসব মালামাল পৌঁছানোর পর অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু বিল অব অ্যান্ট্রি তৈরি বা অ্যাসেসমেন্ট হয়নি, সেসব মালামাল বিল অব অ্যান্ট্রি ছাড়া এলসির বিপরীতে পেমেন্ট রিলিজের সুযোগ দেওয়া।
৭. ক্ষতিগ্রস্ত মালামাল সহজে ছাড়ের ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থাৎ বিল অব অ্যান্ট্রি ওভারডিউ দেখিয়ে বিল লক করা যাবে না। উৎপাদন ব্যবস্থা সচল রাখতে সব ধরনের কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে।
৮. ক্ষতিগ্রস্ত মালামালের বিল অব অ্যান্ট্রির বিপরীতের মালামাল দিয়ে উৎপাদিত ফাইনাল প্রোডাক্টের ধার্য করা ভ্যাট মওকুফ করা।
৯. মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে অনুমতি নিয়ে আমদানি করা পণ্যগুলো আগের অনুমোদনের ভিত্তিতে দ্রুততম সময়ে পুনরায় আনার অনুমতি দেওয়া।
১০. কার্গো ভিলেজ সম্পর্কিত কাস্টম হাউসকে অফিস ছুটির পর এবং শুক্র ও শনিবার স্বল্প পরিসরে হলেও সক্রিয় রাখা, যাতে পণ্য খালাস করা যায়।
১১. যেসব পণ্যের জন্য কোল্ডচেইন ব্যবস্থা প্রয়োজন হয়, সেসব পণ্য দ্রুত সময়ে রিলিজের ব্যবস্থা করা।
১২. কার্গো ভিলেজে যদি কোনো অক্ষত উপকরণ বা চালান পাওয়া যায়, তবে সেটির নিশ্চয়তা সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে জানাতে হবে। চালানগুলোর দ্রুত মূল্যায়ন ও বর্ধিত সময়ে ডেলিভারির ব্যবস্থা করতে হবে।
১৩. যেসব এয়ারলাইনস শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মালামাল নিয়ে আসে, দ্রুত কার্যক্রম শুরু করার জন্য তাদের গ্রীন সিগনাল দেওয়া।
১৪. ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, কাস্টমস, এনবিআর ও বিমান কর্তৃপক্ষসহ অন্যান্য নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি যৌক্তিক সভা ডেকে সমস্যা সমাধানে সুষ্ঠু পদক্ষেপ নেওয়া।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির ভাইস প্রেসিডেন্ট ও রেনেটা লিমিটেড-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং সিইও সৈয়দ কায়সার কবীর, বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির কোষাধ্যক্ষ এবং হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লি.-এর সিইও মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান, বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সিইও মে. জে. (অব.) মো. মুস্তাফিজুর রহমান, নিপ্রো- জেএমআই ফার্মাসিউটিক্যালস লি.-এর এমডি এবং বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সদস্য আব্দুর রাজ্জাক, ওয়ান ফার্মার ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লি.-এর জিএম (প্রশাসন) জাহিদুল আলম, একমি ল্যাবরোটারিজ লি.-এর পরিচালক ফাহিম সিনহা, স্কোয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লি.-এর নির্বাহী পরিচালক মিজানুর রহমানসহ বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির নির্বাহী কমিটির অন্যান্য সদস্য এবং বিভিন্ন কোম্পানির উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।


