বিশ্বরাজনীতি এখন এক নতুন সন্ধিক্ষণে। পুরোনো মিত্রতা ভেঙে যাচ্ছে, নতুন সমীকরণ গড়ে উঠছে। ঠান্ডা যুদ্ধোত্তর যুগে যেসব জোট ও সংস্থা বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার প্রতীক ছিল, সেগুলো এখন কার্যত অচল।
একদিকে পশ্চিমা প্রভাবের পুনঃমূল্যায়ন, অন্যদিকে দক্ষিণের কণ্ঠস্বরের উত্থান এই দ্বৈত বাস্তবতায় দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল পরিণত হচ্ছে নতুন ভূরাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে। এই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ঢাকায় আয়োজিত বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৫ (বিওবিসি) শুধু একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন নয় এটি বাংলাদেশের এক বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান ঘোষণা, যেখানে সংলাপ, গবেষণা ও নাগরিক সহযোগিতার মাধ্যমে দক্ষিণ নিজেকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে চাইছে।
বহু বছর ধরেই দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্ক নিষ্ক্রিয় অবস্থায়। দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা ও রাজনৈতিক অবিশ্বাস এই সংস্থাকে প্রায় অকার্যকর করে তুলেছে।
একইভাবে বিমস্টেক বা অন্যান্য আঞ্চলিক উদ্যোগগুলোও কাঙ্ক্ষিত গতিশীলতা অর্জন করতে পারেনি। অথচ এই অঞ্চলেই জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, খাদ্যনিরাপত্তা ও জ্বালানি সংকটের মতো যৌথ সমস্যা তীব্রভাবে দেখা দিচ্ছে। এমন এক সময়ে নাগরিক পর্যায়ে সংলাপভিত্তিক একটি প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস)–এর বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন, যা রাষ্ট্রীয় কূটনীতির বাইরে গিয়ে নতুন এক আঞ্চলিক বুদ্ধিবৃত্তিক সংহতির জায়গা তৈরি করছে।
এ বছরের মূল থিম, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী, ভাঙন এবং পুনর্বিন্যাস’, অর্থাৎ পরিবর্তিত মিত্রতা ও ক্ষমতার নতুন বিন্যাস সময়োপযোগী এক আহ্বান। এখনকার বিশ্বে স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রু বলে কিছু নেই।
যুক্তরাষ্ট্র–চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কিংবা বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার টানাপোড়েন সবই ক্ষমতার এক নতুন জ্যামিতি তৈরি করছে। এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণের দেশগুলোর ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তারা এখন শুধু বৈশ্বিক অর্থনীতির চালিকাশক্তি নয়, বরং জলবায়ু সংকট ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীও বটে।
এ কারণেই বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন হয়ে উঠছে এক বিকল্প প্ল্যাটফর্ম যেখানে দক্ষিণ নিজের অভিজ্ঞতা থেকে কথা বলে, উত্তর-নির্ভর ধারণা নয়, বরং বাস্তব জীবনের সংকট থেকে সমাধান খোঁজে। এটি এমন এক বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্র তৈরি করছে, যেখানে গবেষক, সাংবাদিক, নীতিনির্ধারক ও তরুণরা একত্রে ভাবতে পারে: কীভাবে আমরা এই পরিবর্তিত বিশ্বের মধ্যে দক্ষিণের দৃষ্টিকোণকে কেন্দ্রস্থলে আনতে পারি।
এবারের আলোচ্য বিষয়গুলোর প্রতিটিই বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক। “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিভ্রান্তি, এবং জ্ঞানের অস্ত্রায়ন” বিষয়টি বিশেষভাবে জরুরি। তথ্য বিকৃতি, বিভ্রান্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার শুধু রাজনীতি নয়, সমাজের আস্থার কাঠামোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
এই প্রেক্ষাপটে সিজিএস-এর উদ্যোগটি প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে বরং জ্ঞানের গণতন্ত্রীকরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের বার্তা দিচ্ছে। একইভাবে “নিষেধাজ্ঞা, ঋণ এবং ঝুঁকিমুক্তির যুগে অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাস”—বিষয়টি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও মিলে যায়।
নিষেধাজ্ঞা ও ঋণচাপে বৈশ্বিক অর্থনীতি যখন টালমাটাল, তখন বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও নীল অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে। বঙ্গোপসাগর কেবল সমুদ্র নয়, এটি ভবিষ্যতের জ্বালানি, বাণিজ্য ও খাদ্যনিরাপত্তার উৎস।
সবশেষে “উষ্ণায়ন উপসাগরে জলবায়ু, সীমানা এবং নিরাপত্তা”—বিষয়টি শুধু পরিবেশের নয়, মানবিক নিরাপত্তার প্রশ্নও। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে উপকূলীয় জীবন, অভিবাসন ও সীমান্ত নিরাপত্তা এখন পরস্পর যুক্ত। এই বাস্তবতা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে যেমন প্রভাব ফেলছে, তেমনি মানবতার নতুন সংজ্ঞাও তৈরি করছে।
আজ যখন পুরোনো আঞ্চলিক সংস্থাগুলো তাদের কার্যকারিতা হারাচ্ছে, তখন এমন বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপমঞ্চই হতে পারে ভবিষ্যতের কূটনীতি। বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন বাংলাদেশের জন্য কেবল ভাবের উৎসব নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের এক চিন্তাশীল অগ্রযাত্রা যেখানে সহযোগিতার ভাষা প্রতিরোধের চেয়ে বেশি শক্তিশালী।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)