স্পোর্টস ডেস্ক
ঢাকা: ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ আয়োজিত জাতীয় পর্যায়ের অনূর্ধ্ব-১৪ মেয়েদের ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে রংপুর বিভাগ। গত সোমবার বিকেলে ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে উপস্থিত থেকে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। ফাইনালে রংপুর শিরোপা জিতলেও গোটা টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে সবার নজর কেড়েছেন রাজশাহী বিভাগের হয়ে খেলা নাটোরের বিস্ময় বালিকা জান্নাতুল ফেরদৌস ফারিহা ওরফে ফারিহা মনি।
ফাইনালে পরাজিত হলেও এর আগে বরিশাল অঞ্চলকে ৫-০ গোলে ও খুলনাকে ২-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে ফাইনালে পৌঁছায় রাজশাহী অঞ্চল। দলের এই বিশাল জয়ের পেছনে একক অবদান ছিল ফারিহার। তার জাদুকরী পা থেকেই এসেছে গুরুত্বপূর্ণ দুই ম্যাচের ৭টি গোলের মধ্যে ৫টি।
রাজশাহী বিভাগের নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার নান্দরায়পুর গ্রামে জন্ম নেওয়া এই কিশোরীর ফুটবলের আঙিনায় উঠে আসার গল্পটা মোটেও সহজ ছিল না। স্থানীয় নান্দরায়পুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া ফারিহার পারিবারিক জীবন চরম প্রতিকূলতা আর অভাব-অনটনে ঘেরা। তার বাবা মুকুল মণ্ডল বাকপ্রতিবন্ধী হওয়ায় তেমন কোনো কাজকর্ম করতে পারেন না। এক বোন ও এক ভাইসহ ফারিহাদের পাঁচ জনের সংসার। তার মা আজেলা বেগম স্থানীয় এলজিইডির রাস্তায় দিনমজুরের কাজ করে যা আয় করেন, তা দিয়েই কোনো রকমে চলে তাদের সংসারের চাকা।
সংসারের এই টানাপোড়েনের মধ্যেও ফুটবলের স্বপ্নকে বুকে আগলে রেখেছেন ফারিহা। বাবার অনুপস্থিতিতে নিজেদের সামান্য জমিতে ভাইয়ের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাদায় ধান রোপণ কিংবা পচা পানিতে নেমে পাট ধোয়ার মতো কঠিন কায়িক পরিশ্রমও করতে হয় তাকে। এত কিছুর পরও ফুটবলার হওয়ার তীব্র তাড়নায় প্রতিদিনের ক্লান্তি উপেক্ষা করে বাড়ি থেকে দীর্ঘ ৮ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে নর্থবেঙ্গল চিনিকলের পাশের নর্থবেঙ্গল ফুটবল একাডেমিতে গিয়ে নিয়মিত কঠোর অনুশীলন করেছেন তিনি।
আর্থিক অনটনের পাশাপাশি ফারিহার ফুটবলার হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিল সমাজের রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি। ‘মেয়ে মানুষ কেন হাফপ্যান্ট পরে ফুটবল খেলবে!’, ‘পড়ালেখা শেষ করে বিয়ে করে সংসার সামলানোই মেয়েদের প্রধান কাজ’—গ্রামীণ সমাজের এমন হাজারো কটু কথা শুনতে হয়েছে তাকে। তবে পরিবার সব সময় পাশে ছিল। লোকলজ্জা আর সমাজের বাঁকা চোখকে উপেক্ষা করে ফারিহা নিজের লক্ষ্যে অবিচল থেকেছেন।
ফারিহা জানান, এই লড়াইয়ে তার পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন কোচ মোহাম্মদ জুয়েল। অনুশীলনে যাওয়ার ভাড়া বা বুট কেনার টাকা না থাকলে নিজের সন্তানের মতো সব ব্যবস্থা করেছেন তিনি। দিয়েছেন দরকারি হাতখরচ ও যাতায়াত ভাড়া।
তৃতীয় শ্রেণি থেকে ফুটবলের আঙিনায় পা রাখা ফারিহা ইনজুরির কারণে উপজেলা পর্যায়ে খেলতে না পারলেও, চোট সারিয়ে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে দুর্দান্ত পারফর্ম করে জাতীয় আসরে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন। জাতীয় দলের তারকা ফরোয়ার্ড ঋতুপর্ণা চাকমা তার প্রিয় ফুটবলার। প্রিয় খেলোয়াড়ের প্রতি ভালোবাসা থেকেই নিজের জার্সির নম্বর ১৭ বেছে নিয়েছেন তিনি। তবে বরিশাল ও খুলনার বিপক্ষে গোল করার কৃতিত্ব একা নিতে নারাজ এই বিনয়ী কিশোরী; তার মতে, সহখেলোয়াড়দের দারুণ পাসের কারণেই গোলগুলো সম্ভব হয়েছে।
কোনো ক্লান্তি, অভাব কিংবা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা যাকে থামাতে পারেনি, গ্রামীণ জনপদের সেই মেঠো পথ থেকে শুরু হওয়া ফারিহার সাইকেলযাত্রা একদিন পৌঁছে যাবে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে—এমনটাই প্রত্যাশা নাটোরের মানুষের। ইতোমধ্যে নাটোর-১ আসন থেকে নির্বাচিত সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল এমপি নিজের ফেসবুক পেজে ফারিহাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে লিখেছেন, “বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে এমন ফারিহার জন্ম হোক, এটাই প্রত্যাশা।”
বাংলাফ্লো/এম এইচ এইচ












