আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ঢাকা: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধসংক্রান্ত ক্ষমতা সীমিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব এগিয়ে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট। মঙ্গলবার (১৯ মে) অনুষ্ঠিত এক দ্বিপক্ষীয় ভোটে প্রস্তাবটি পরবর্তী ধাপে নেওয়ার পক্ষে রায় দেন আইনপ্রণেতারা। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে হোয়াইট হাউসের একক সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার ওপর বড় ধরনের আইনগত খড়্গ নেমে আসার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
রিপাবলিকানদের দলছুট ভোট ও ডেমোক্র্যাটদের যৌথ প্রয়াস: সিনেটে অনুষ্ঠিত এই ভোটাভুটিতে প্রস্তাবটি পরবর্তী ধাপে নেওয়ার পক্ষে ভোট পড়ে ৫০টি এবং বিপক্ষে পড়ে ৪৭টি। এই বিলটির অগ্রযাত্রায় সবচেয়ে বড় চমক ছিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিজস্ব দল রিপাবলিকান পার্টির চারজন সিনেটরের অবস্থান। তারা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ডেমোক্র্যাটদের আনা এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন। তবে বিলটি আইন হিসেবে কার্যকর হওয়ার জন্য এখনও চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে।
এই প্রস্তাবের মূল দাবি হলো— মার্কিন কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে একক সিদ্ধান্তে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কোনো ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে রাখা হবে না। প্রস্তাবটির সমর্থক ও আইনপ্রণেতারা স্পষ্ট মত দেন যে, মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা করার একক ক্ষমতা কেবল কংগ্রেসের হাতেই থাকা উচিত, প্রেসিডেন্টের হাতে নয়।
কূটনৈতিক সমাধানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের অভিযোগ: প্রস্তাবটির মূল উত্থাপক ভার্জিনিয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেটর টিম কেইন বলেন, ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির চলমান আন্তর্জাতিক আলোচনা কংগ্রেসে এই বিষয়টি নিয়ে বিশদ বিতর্কের একটি উপযুক্ত সময় তৈরি করেছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, তেহরানের পক্ষ থেকে শান্তি ও কূটনৈতিক সমাধানের যে একাধিক প্রস্তাব এসেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কংগ্রেসের সাথে কোনো ধরনের আলোচনা বা পরামর্শ না করেই তা একতরফাভাবে প্রত্যাখ্যান করছেন।
এর আগে চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ে সিনেটে ট্রাম্পের যুদ্ধসংক্রান্ত ক্ষমতা কমানোর এ ধরনের আরও সাতটি প্রস্তাব রিপাবলিকানরা নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আটকে দিয়েছিল। এছাড়া প্রতিনিধি পরিষদেও (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) তিনটি অনুরূপ প্রস্তাব অত্যন্ত অল্প ব্যবধানের ভোটে নাকচ হয়ে যায়। তবে মঙ্গলবারের সমীকরণ ছিল ভিন্ন। এই ভোটে পেনসিলভানিয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন ফেটারম্যান একমাত্র ডেমোক্র্যাট হিসেবে প্রস্তাবটির বিপক্ষে অবস্থান নেন। অন্যদিকে রিপাবলিকান দলের চার প্রভাবশালী সিনেটর— র্যান্ড পল, সুসান কলিন্স, লিসা মুরকোসি এবং বিল ক্যাসিডি ট্রাম্পের বিপক্ষে ও প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেন।
ওয়ার পাওয়ারস আইন ও বর্তমান সংঘাতের প্রেক্ষাপট: যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৩ সালের ঐতিহাসিক ‘ওয়ার পাওয়ারস আইন’ (War Powers Act) অনুযায়ী, যেকোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের পূর্ব অনুমোদন ছাড়া সর্বোচ্চ ৬০ দিন পর্যন্ত যেকোনো দেশে সামরিক অভিযান চালাতে পারেন। এই ৬০ দিনের পর যদি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়, তবে অবশ্যই কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হয় অথবা সেনা প্রত্যাহারের জন্য অতিরিক্ত ৩০ দিনের আইনি সময় চাইতে হয়।
গত ১ মে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক ঘোষণায় দাবি করেছিলেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান কার্যত শেষ হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই ঘোষণার পরও মার্কিন নৌবাহিনী ইরানি জাহাজে চোরাগোপ্তা হামলা ও দেশটির আন্তর্জাতিক বন্দরগুলোতে কঠোর অবরোধ জারি রেখেছে। এর জবাবে ইরানও কৌশলগত হরমুজ প্রণালি অবরোধের চেষ্টা করছে এবং মার্কিন রণতরী ও বাণিজ্যিক জাহাজে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি কিছু রিপাবলিকানও মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আগে প্রেসিডেন্টের উচিত কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নেওয়া। অন্যদিকে হোয়াইট হাউস ও ট্রাম্পপন্থি কট্টর রিপাবলিকানরা জোরালো দাবি করছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রেসিডেন্ট প্রধান সেনাপতি (কমান্ডার-ইন-চিফ) হিসেবে যেকোনো স্থানে সীমিত সামরিক অভিযান পরিচালনার পূর্ণ সাংবিধানিক অধিকার রাখেন।
বাংলাফ্লো/এফআইআর






