আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ঢাকা: নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) চিফ প্রসিকিউটর তাঁর বিরুদ্ধে একটি গোপন আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আবেদন করেছেন বলে দাবি করেছেন ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোতরিচ। মঙ্গলবার (১৯ মে) রাজধানী জেরুজালেমে অর্থ মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি নিজেই এই চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁসি করেন।
সংবাদ সম্মেলনে স্মোতরিচ আইসিসির এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে একে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সরাসরি একপ্রকার ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে ক্ষোভ উগরে দিয়ে বেজালেল স্মোতরিচ বলেন:
“গত রাতে (সোমবার) আমাকে অবহিত করা হয়েছে যে, হেগ শহরের ইহুদিবিদ্বেষী আদালতের ফৌজদারি প্রসিকিউটর আমার বিরুদ্ধে একটি গোপন আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আবেদন জমা দিয়েছেন। আমার বিরুদ্ধে এই পরোয়ানার আবেদনের মাধ্যমে আইসিসি মূলত সামগ্রিক ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। তারা চায় আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ার ভয় দেখিয়ে ইসরায়েল যেন নিরাপত্তাগত দিক থেকে একপ্রকার আত্মহনন বা আত্মহত্যা করুক।”
তিনি আরও যোগ করেন, “যারা চিরদিন অন্ধভাবে ইসরায়েলের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে, সেসব চরম পক্ষপাতদুষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভণ্ডামিপূর্ণ কোনো নির্দেশনা বা ডিক্টেট আমরা মোটেও গ্রহণ করব না। ইউরোপের একটি বড় অংশ এখন পর্যন্ত মন থেকে ইহুদিদের ভালোবাসতে পারেনি। ইসরায়েল ও ইহুদি প্রশ্নে এই ভণ্ডামি আর দ্বৈত অবস্থান এখন পর্যন্ত ইউরোপের অনেক দেশের মজ্জাগত নীতি।”
আইসিসির প্রসিকিউটর অফিস থেকে এই গোপন পরোয়ানার আবেদনের সুনির্দিষ্ট কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে গোপন রাখা হলেও, সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে ইসরায়েলি দৈনিক ‘হারেৎজ’ (Haaretz) একটি বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন ও বিধিনিষেধ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীর (West Bank) অঞ্চলে অবৈধভাবে ব্যাপক ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ এবং বসতি স্থাপনকারীদের জন্য আবাসন নির্মাণ প্রকল্পে সামনে থেকে মূল নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্যমতে, আইসিসি মূলত ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) ৩ জন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা এবং ২ জন শীর্ষ রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে এই গোপন পরোয়ানা জারির প্রক্রিয়া শুরু করেছে। যে দু’জন রাজনীতিবিদের নাম এই তালিকায় উঠে এসেছে, তাঁদের একজন অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোতরিচ এবং অন্যজন যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম ‘মিডল ইস্ট আই’-এর সূত্র মতে, ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন-গিভির। তবে অভিযুক্ত ৩ জন আইডিএফ কর্মকর্তার নাম-পরিচয় বা এই আবেদন সুনির্দিষ্ট কোন তারিখে করা হয়েছে, তা আইনি গোপনীয়তার স্বার্থে এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
এ বিষয়ে নিজের বিতর্কিত ভূমিকার সাফাই গেয়ে সোমবার স্মোতরিচ বলেন, “আমাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ তোরাহ এবং বাইবেলে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, ইহুদিদের আদি মাতৃভূমি হলো জুদেয়া এবং সামারিয়া (বর্তমান পশ্চিম তীর)। আমি আমার চিরন্তন মাতৃভূমিতে একশরও বেশি নতুন ইহুদি বসতি ও খামার গড়ে তোলার এই বিপ্লবে নেতৃত্ব দিতে পেরে সম্মানিত বোধ করছি। আমরা শুধু আমাদের মাতৃভূমি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছি।”
আইসিসির এই পদক্ষেপের জন্য ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে (PA) দায়ী করে স্মোতরিচ পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে পশ্চিম তীরের রামাল্লাভিত্তিক ফিলিস্তিনি প্রশাসনের ওপর অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ‘যুদ্ধ’ শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন। এর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে তিনি পূর্ব জেরুজালেমের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ফিলিস্তিনি বেদুইন গ্রাম ‘খান আল-আহমার’ (Khan al-Ahmar) সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখানকার দেড় শতাধিক বাসিন্দাকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করার জন্য একটি উচ্ছেদ আদেশে সই করার ঘোষণা দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক মহলের দীর্ঘদিনের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও এই উচ্ছেদ অভিযানকে তিনি ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে তাঁর মূল জবাব হিসেবে দেখছেন।
উল্লেখ্য, এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে গাজা উপত্যকায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল আইসিসি। এবার পশ্চিম তীরের বসতি স্থাপনকে কেন্দ্র করে স্মোতরিচ ও বেন-গিভিরের মতো কট্টরপন্থী মন্ত্রীদের ওপর আইসিসির এই সাঁড়াশি চাপ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকে আরও বেশি উত্তপ্ত করে তুলবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।
বাংলাফ্লো/এফআইআর






