আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ঢাকা: আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকাভিমুখী মানবিক ত্রাণবাহী নৌবহর ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’র ওপর আবারও সামরিক চড়াও হয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। গতকাল মঙ্গলবার (১৯ মে) বহরের অন্তত দুটি জাহাজে ইসরায়েলি নৌবাহিনী সরাসরি গুলি চালিয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ করেছেন আয়োজকেরা। হামলার একটি লাইভ ভিডিও ফুটেজেও গুলির দৃশ্য স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে। গুলি ও অভিযানের পর বহরে থাকা ৫০টি নৌযানের সব কটিই সাগরে আটক করেছে ইসরায়েল।
তবে বরাবরের মতোই ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা কোনো প্রাণঘাতী সামরিক গুলি ব্যবহার করেনি এবং এ ঘটনায় কেউ হতাহত হননি। এর আগে গত এপ্রিল মাসের শেষ দিকেও (৩০ এপ্রিল, ২০২৬) গাজামুখী গ্লোবাল সুমুদের একটি বড় বহর আন্তর্জাতিক জলসীমায় নির্মমভাবে আটকে দিয়েছিল তেল আবিব। এবার সেই বাধা উপেক্ষা করে ত্রাণ নিয়ে গাজায় পৌঁছানোর তৃতীয় দফা চেষ্টা করছিল আন্তর্জাতিক এই বহরটি।
গ্লোবাল সুমুদের সমুদ্রযাত্রার দৃশ্য স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরাসরি (লাইভ) সম্প্রচার করা হচ্ছিল। সেই লাইভ ভিডিওতে দেখা যায়, ইসরায়েলি কমান্ডোরা দুটি ফ্লোটিলা নৌযানে চড়াও হয়ে গুলি ছুড়ছেন। তবে তারা কী ধরনের বা কত ক্যালিবারের গুলি ব্যবহার করেছেন, তা ভিডিওতে স্পষ্ট নয়।
ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে সমালোচনা শুরু হলে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে সাফাই গেয়ে বলে, ‘সেখানে কখনই প্রাণঘাতী আসল গুলি ব্যবহার করা হয়নি।’ বিবৃতিতে তারা আরও দাবি করে, ‘একাধিকবার সতর্ক করার পরও ফ্লোটিলা এগিয়ে আসছিল। তাই বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে নয়; বরং চূড়ান্ত সতর্কবার্তা হিসেবে নৌযানগুলো লক্ষ্য করে প্রাণঘাতী নয়—এমন বিশেষ অ-অস্ত্র ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনায় কোনো বিক্ষোভকারী আহত হননি।’
অভিযানের পর গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে, পূর্ব ভূমধ্যসাগরে এবারের বহরে থাকা ৫০টি নৌযানের সব কটিই ইসরায়েলি নৌবাহিনী সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আটক করেছে। একই সাথে বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশের ৪২৮ জন শান্তিকামী ও সমাজকর্মী অংশগ্রহণকারীকেও জোরপূর্বক বন্দি করেছে ইসরায়েল। আটককৃতদের মধ্যে তুরস্কের সর্বোচ্চ ৭৮ জন নাগরিক রয়েছেন।
এদিকে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, ৪৩০ জন আন্দোলনকর্মীর সবাইকে ইসরায়েলি যুদ্ধজাহাজে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং তারা বর্তমানে ইসরায়েলের সমুদ্রবন্দরের পথে রয়েছে। মন্ত্রণালয় আরও জানায়, আটককৃতদের নিজ নিজ দেশের কনস্যুলার প্রতিনিধির সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী দেখা করার অনুমতি দেওয়া হবে। তবে কেন ইসরায়েল ও নৌবহর কর্তৃপক্ষ আটককৃত ব্যক্তিদের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য (৪২৮ বনাম ৪৩০) দিচ্ছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হওয়া যায়নি।
অভিযানের আগের দিন গত সোমবার (১৮ মে) ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সামাজিক মাধ্যম এক্সে (টুইটার) এক পোস্টে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছিল— তারা গাজা উপত্যকার ওপর আরোপিত তাদের ‘বৈধ নৌ অবরোধের’ কোনো ধরনের লঙ্ঘন বা ফাটল ধরতে দেবে না।
এরই প্রতিক্রিয়ায় ওই দিন রাতে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় এক রাষ্ট্রীয় ভাষণে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ফ্লোটিলার মানবিক কার্যক্রমে ইসরায়েলি সামরিক হস্তক্ষেপের তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একই সাথে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের দায়ে ইসরায়েলের এই বেপরোয়া পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বিশ্ব সম্প্রদায় ও জাতিসংঘকে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
উল্লেখ্য, গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার জাহাজগুলো গত বৃহস্পতিবার তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর থেকে গাজার উদ্দেশ্যে তাদের তৃতীয়বারের মতো ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু করেছিল। এর আগে গাজায় ৫ হাজার টনেরও বেশি জরুরি খাদ্য ও চিকিৎসা ত্রাণ পৌঁছানোর জন্য তাদের আগের দুটি প্রচেষ্টাই মাঝসমুদ্রে হামলা চালিয়ে ব্যর্থ করে দেয় ইসরায়েল।
এদিকে, ইসরায়েলের এই সামরিক অভিযানের সমান্তরালে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, তারা এই ত্রাণবাহী ফ্লোটিলার সঙ্গে যুক্ত ও অর্থায়ন করা চারজন শীর্ষ ব্যক্তির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে। ওয়াশিংটনের দাবি, ওই চার ব্যক্তি মূলত হামাসপন্থী কার্যক্রমের সাথে জড়িত।
বাংলাফ্লো/এফআইআর






