আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ঢাকা: যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যকার সর্বশেষ পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি ‘নিউ স্টার্ট’-এর মেয়াদ আজ বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) শেষ হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী প্রায় ৩০ বছরের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও সহযোগিতার যুগের অবসান ঘটছে। এই চুক্তির অবসানের ফলে বিশ্বের দুই বৃহত্তম পারমাণবিক শক্তিধর দেশের অস্ত্র মোতায়েনের ওপর আর কোনো আইনি সীমা থাকছে না, যা বিশ্বকে এক নিয়ন্ত্রণহীন ও বিপজ্জনক অস্ত্র প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বের মোট পারমাণবিক অস্ত্রের প্রায় ৮৭ শতাংশই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার হাতে, তাই চুক্তিটির পতন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ অশনিসংকেত।
জাতিসংঘ সতর্ক করে জানিয়েছে, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি এখন গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা স্নায়ুযুদ্ধের পর সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি। সংস্থাটি উভয় দেশকে জরুরি ভিত্তিতে চুক্তিটি নবায়নের আহ্বান জানালেও ডোনাল্ড ট্রাম্প বা ভ্লাদিমির পুতিন—কেউই এটি দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে প্রবল আগ্রহ দেখাননি।
চুক্তির অবসান ও ৩০ বছরের ইতিহাসের ইতি ২০১০ সালে বারাক ওবামা ও দিমিত্রি মেদভেদেভের স্বাক্ষরিত ‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তির মাধ্যমে উভয় দেশকে সর্বোচ্চ ১,৫৫০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড এবং ৭০০টি ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমারু বিমান রাখার কঠোর সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। আজ এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় পারমাণবিক ওয়ারহেড মোতায়েনের ওপর থেকে সব ধরনের বিধিনিষেধ উঠে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া পুনরায় অনিয়ন্ত্রিত অস্ত্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে পারে, যার সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধনশীল অস্ত্র ভাণ্ডার যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।
ট্রাম্পের ‘গোল্ডেন ডোম’ ও রাশিয়ার অবস্থান চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রাক্কালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ওয়াশিংটন সম্মত হলে আরও এক বছরের জন্য বিধিনিষেধ মেনে চলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এ বিষয়ে এখনও স্পষ্ট কোনো অবস্থান নেয়নি। বরং ট্রাম্প প্রশাসন ২০২৫ সালে ‘গোল্ডেন ডোম’ নামক একটি উচ্চাভিলাষী ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঘোষণা দিয়েছে, যার প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৭৫ বিলিয়ন ডলার। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ রাশিয়া ও চীনকে তাদের আক্রমণাত্মক অস্ত্রের সংখ্যা বাড়াতে প্ররোচিত করবে। আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী পরিচালক ড্যারিল কিমবল সতর্ক করে বলেছেন, প্রায় ৩৫ বছর পর প্রথমবারের মতো উভয় পক্ষই তাদের পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে।
জাতিসংঘের উদ্বেগ ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা জাতিসংঘের মতে, এই চুক্তি না থাকা মানে পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি কমাতে বিদ্যমান বৈশ্বিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের ফাটল সৃষ্টি হওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট পারমাণবিক পরীক্ষায় বিস্ফোরণ না ঘটানোর কথা বললেও, ওয়াশিংটন যদি পুনরায় পরীক্ষা শুরু করে, তবে রাশিয়াও পাল্টা জবাব দেবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ক্রেমলিন। সব মিলিয়ে, নিউ স্টার্টের অবসান, ট্রাম্পের ‘গোল্ডেন ডোম’ পরিকল্পনা এবং জাতিসংঘের চরম সতর্কবার্তা—সব মিলিয়ে বিশ্ব এখন এক নজিরবিহীন পারমাণবিক ঝুঁকির যুগে প্রবেশ করল।
বাংলাফ্লো/এফআইআর



