শামসুন নাহার আহমেদ এক মহীয়সী নারী ছিলেন। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের নেত্রী, সংসদ সদস্য, কলেজ অধ্যক্ষ আর ছোটবেলা থেকেই ছিলেন সাংস্কৃতিক লড়াই-এর সম্মুখ সারির একজন। একাত্তরের আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থাকা অবস্থায় ছাত্র ইউনিয়ন থেকে মন্নুজান হলের ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।
মাগুরার এই কৃতি নারীকে ‘মুকুল দিদি’ বলে জানে সবাই। তার মায়ের নাম রত্নগর্ভা বেগম ওয়াজেদা আহমেদ। তার বাবার নাম জহুর আহমেদ। ছয় সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। দুই ভাইয়ের পরে তার জন্ম। তার বড় ভাই প্রয়াত রাজনীতিক মে. জে. (অব.) এম মজিদ উল হক। তিনি বিএনপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং কয়েক দফা মন্ত্রী ছিলেন। বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যার কারণে ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসের ২৬ অক্টোবর শামসুন নাহার আহমেদ মৃত্যুবরণ করেন। আজ তার অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী।
শামসুন নাহার ছোটবেলায় কিছু সময় দিল্লিতে থেকেছেন। যেহেতু তার বাবা জহুর আহমেদ তৎকালীন অবিভক্ত ভারত সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি তার বাবার মৃত্যুর পর চলে আসেন মাগুরায়। পরিবারের সঙ্গে শহরের নিকটবর্তী পারনান্দুয়ালি গ্রামে থাকতেন তখন। সেখান থেকে মাগুরা শহরে স্কুলে যেতেন। মাধ্যমিকের পরে তাকে তার মা লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার জন্য কলকাতায় পাঠিয়ে দেন। সে সময় এরকম একটি কলেজে পড়া চাট্টিখানি ব্যাপার ছিল না। ১৯৪৯ সালে এই কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেন তিনি। সেখানে থাকাকালীন তার পরিচয় হয় সেই সময়ের অনেক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সাথে। একটা সময় তিনি জড়িয়ে পড়েন বাম রাজনীতিতে এবং বাম রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। সে সময় তিনি গান শিখতেন কলিম শরাফির কাছে। ৬৭ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে বাংলা সাহিত্যে এম এ পাশ করেন।
তিনি মাগুরায় ফিরে এসে মাগুরার বর্তমান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের প্রথম মহিলা লেকচারার হিসেবে যোগ দেন। যদিও তার যোগ দেওয়া নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে অনেক মতামত ছিলো। তবে বিতর্ক ছিল, কোনো মহিলা লেকচারার কেন কলেজে পড়াতে আসবেন! কারণ তখনকার সময়ের সামাজিক প্রেক্ষাপটে এটা স্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু তিনি পিছিয়ে যাওয়ার মানুষ নন। তার সমর্থনে ছিলেন তৎকালীন অধ্যক্ষ এবং কমিটির কয়েকজন সদস্য। তিনি সেখানে যোগ দেন এবং সাফল্যের সাথে সেখানে তার দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। সেই সময়ে যারা তার ছাত্র ছিলেন, তারা এখন অনেকেই সুপ্রতিষ্ঠিত এবং শ্রদ্ধার সাথে তাকে স্মরণ করেন। কলেজের সবাইকে সাংস্কৃতিক দিকে মনযোগী ও সক্রিয় করতে তার ভুমিকা ছিল অনন্য।

তিনি সাংস্কৃতিক অনেক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিলেন। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সক্রিয় থাকা ছিল তাদের পারিবারিক প্রথার মত। সেই ধারাবাহিকতায় মাগুরায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য প্রাথমিক কার্যক্রম সম্পন্ন হত তার পরিবার থেকেই। তিনি সকলকে নিয়ে খুবই সুন্দরভাবে অনুষ্ঠানের মহড়া দিতেন। তিনি সেই সময়ে আরো অনেক মেয়েকে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রবেশে উৎসাহী করে তুলতেন। তার প্রেরণায় অনেক মেয়ে শিল্পী এগিয়ে আসেন।
মাগুরায় ললিতকলা একাডেমি ও শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার পেছনে তার বড় ভূমিকা ছিল এবং তিনি সকলের সাথে একযোগে কাজ করেন। সেই ধারাবাহিকতায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হলে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন এবং অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকেছেন। চিত্রনাট্য লেখা থেকে মঞ্চ সজ্জা, পোশাক পরিকল্পনা থেকে স্টেজ রিহার্সাল, বিভিন্ন কাজে সরাসরি অংশ নিতেন। তার কাছে যারা গান শিখেছেন তারাও অত্যন্ত গুণমুগ্ধ ছিলেন তার প্রতি। তার মধ্যে মিহিরলাল কুরি, চন্দ্রপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় এদের নাম উল্লেখযোগ্য।
এরপর তিনি কলেজের চাকরি ছেড়ে দেন। সিদ্ধান্ত নেন নতুন করে সংসার জীবন শুরু করার। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী স্বামীর ব্যবসায় মনোযোগ দেন ও ঢাকায় থাকা শুরু করেন। ঢাকা থাকাকালীন তিনি বিজনেস ডেভলপমেন্ট সেন্টার থেকে ডিপ্লোমা করেছেন। তিনি স্বামীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে স্বামীর সফর সঙ্গী হয়েছেন। এই সময় তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমাজসেবামূলক এবং ব্যবসায়ীক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন। এরই মাঝে তাদের সংসারে কন্যা সন্তান আসে।
এর পরে একটা সময়ে তিনি আবার মাগুরায় ফিরে যোগ দেন কামারখালি কলেজে। তখন এটা ছিল কো-এডুকেশন কলেজ, যেখানে সহশিক্ষা প্রচলিত ছিল। একটি কো-এডুকেশন কলেজে মহিলা প্রিন্সিপাল, বাংলাদেশে খুব কমই দেখা যেত। কিন্তু তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে এই দায়িত্ব ভার বুঝে নেন। কলেজের উন্নয়নের জন্য তিনি সাধ্যমত সকল প্রকার উদ্যোগ যেমন কমনরুম, লাইব্রেরী, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, বিজ্ঞান গবেষণাগার স্থাপন করেন। বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষার জন্য তার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে মেয়ে শিক্ষার্থীরা যেন পড়াশোনা বন্ধ না করে সে ব্যাপারে কাউন্সিলিং করতেন, অভিভাবকদের সাথে কথা বলতেন, নানা রকম পরামর্শ দিতেন। মেয়েদের যেন অন্তত এখানে যতটুকু পর্যন্ত পড়ানো যায় ততটুকু যেন পড়ান, সেই অনুরোধ করতেন। সেই সময় ঐ কলেজে স্নাতক পর্যন্ত পড়ানো হত। মেয়েদের কলেজে উঠলেই বিয়ে না দেয়ার পরামর্শ দিতেন।
আশেপাশের গ্রামের অনেক মেয়েও ঐ কলেজ থেকে পড়ালেখা শেষ করেন এবং অনেক মহিলা লেকচারার কলেজে যোগ দেন। কলেজটিকে এমপিওভুক্ত করার জন্য অনেক চেষ্টা করেছেন তিনি। তিনি যখন জানতে পারেন এই এলাকারই সন্তান বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ। তখন তিনি কলেজটিকে মুন্সী আব্দুর রউফের নামে নামকরণ করার জন্য গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মূলত তার উদ্যোগেই এলাকাবাসীর সহযোগিতায় প্রথম বীরশ্রেষ্ঠ আব্দুর রউফ কলেজ, কামারখালি নামকরন করা হয়। বর্তমানে এটি সরকারী কলেজ।

সমাজ সেবা, শিক্ষা সংস্কৃতি, এইসব ক্ষেত্রে তিনি সব সময় সক্রিয় ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৯১ সালে এই এলাকার প্রথম মহিলা সংসদ সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে যোগ দেন। মাগুরা, ঝিনাইদহ, নড়াইল এই তিন আসনে তিনি প্রতিনিধিত্ব করেন। জাতীয় সংসদের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এর বিশেষ কমিটির একজন সদস্য ছিলেন তিনি। এই কারণে দেশের অনেক স্থানে সফর করেন। সংসদ সদস্য থাকাকালীন এলাকার উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। বিশেষ করে স্কুল কলেজ মাদ্রাসা, শিক্ষা সংস্কৃতি বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল বেশি। তিনি নারীর ক্ষমতায়নে সেলাই মেশিন, ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবস্থা করেন। তিনি নারীদের সক্রিয় রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে অংশ নিতে সব সময় উৎসাহ দিতেন। সংসদ সদস্য থাকাকালীন তিনি ইরান, মিশর এবং যুক্তরাজ্য সফর করেন।
মাগুরার এই কন্যা, যিনি অনেক ক্ষেত্রে প্রথমা, অনেক ক্ষেত্রে অন্যতমা, তিনিই আজকের প্রজন্মের এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করেছিলেন। শিক্ষা সংস্কৃতি রাজনীতি সমাজসেবা, সবখানে থেকেছেন যোগ্যতা ও দক্ষতা নিয়ে। তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় কলাম লিখতেন। বেসরকারি কলেজ শিক্ষক সমিতির প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ডিপ্লোমা করেছেন। পরবর্তীতে ঢাকায় বসবাস করলেও মাঝে মাঝে মাগুরায় যেতেন। তবে আর কোনো কাজে নতুন করে জড়িত হননি। বাসায় বসেই লেখালেখি করতেন, পড়াশুনা করতেন। ২০১৫ সালে তিনি একটি স্মৃতিচারণমূলক বই লিখেন। বইটির নাম “আমার সময়”। প্রচ্ছদ ধ্রুব এষের। বই-এর এক জায়গাতে লিখেছেন- ‘হাসি কান্না আনন্দ বেদনা উত্থান পতন-এসবের সমষ্টিই তো মানুষের জীবন।’ জীবন, সমাজ, সংস্কৃতি নিয়ে তার উপলব্ধি ছিল বড় গভীর।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)