মাগুরার রত্নগর্ভা মা ওয়াজেদা আহমেদের পঞ্চম সন্তান, সিদ্দিক আহমেদ সিদ্দিকী। যিনি অধিক পরিচিত বেবী সিদ্দিকী নামে।
মাগুরার মানুষের প্রিয় এক অহংকার। শুধুমাত্র নিজের ব্যক্তিত্ব বলয়ে সুর্যের মতো উজ্জ্বল, নিঃস্বার্থ পরোপকারী, সদালাপী আর নিরহংকার এই মানুষটা, মাগুরা সহ সারাদেশের অনেক মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় স্মরণ করে।
আজ তাঁর চলে যাওয়ার দিন। ২০০৩ সালের ৮ অক্টোবর তিনি ইন্তেকাল করেন। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। একটা সময় ছিলেন সরকারী চাকরীতে, পরে ব্যবসা করেছেন মাগুরায়। শ্রমিক নেতা হিসেবে খ্যাত ছিলেন।

প্রয়াত রাজনীতিক মেজর জেনারেল (অব) এম মজিদ উল হক, তাঁর বড় ভাই, যিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন নেতা, একাধিক ছিলেন মন্ত্রী। প্রয়াত এমপি, উনসত্তরের গণঅভুত্থানের নেত্রী শামসুন্নাহার আহমেদ, তার একমাত্র বোন এবং তাঁর ছোট ভাই প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসরুর উল হক সিদ্দিকী কমল, বীর উত্তম। তার আরেক ভাই ড. মাহবুব উল হক সিদ্দিকী। মেজ ভাই ছিলেন আইয়ুব হোসেন সিদ্দিকী। ভাই বোনেরা সবাই নিজ নিজ স্থানে প্রতিভা এবং গৌরবের স্বাক্ষর রেখেছেন। তাদের বাবা জহুর আহমেদ, ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের একজন পদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন।
অনাড়ম্বর বর্ণাঢ্য জীবন ছিল তাঁর। চলেও গেছেন অনেকের তুলনায় আগে। যতটুকু সময় ছিলেন, সে সময়ের সীমানা পার হয়ে ভালোবাসায় আছেন বহু মানুষের মনে। নিঃস্বার্থভাবে বহু মানুষের উপকার করেছেন। তাঁর তিন ছেলে মেয়ে ব্যক্তিগত আর পেশাগত জীবনে চমৎকার ভাবে সফল। সুসন্তান সবাই। ছেলে বড়, শাব্বির আহমেদ সিদ্দিকী, সেনা কর্মকর্তা, অবসর নিয়ে যোগ দিয়েছেন কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে, মেয়ে শারমিন সিদ্দিকী নীলা, প্রবাসী, ব্যবসা করছেন। ছোটো মেয়ে শাহনাজ সিদ্দিকী দীপা, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের পোস্টাল ক্যাডারের কর্মকর্তা, আছেন ঢাকায়।
আদর্শবান মানুষ বলতে তিনিই একজন যার চারিত্রিক দৃঢ়তা, সোশাল স্কিল, নেটওয়ার্কিং যত চমৎকার, ততই গভীর তাঁর জীবনদর্শন। তার চরিত্রে কোনো মেকী কিছু আমার মনে পড়ে না। একেবারে স্বচ্ছ পানির মত। ভালো কে ভালো, মন্দ কে মন্দ বলতেন, সেও নিজের মতো করে।
নিজের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে মানুষের উপকার করেই খুশী হয়ে যেতেন। সফল হওয়ার এক অন্য রকম উদাহরণ তিনি। সরকারী চাকরী হয়েছিলো। পরে ছেড়ে দিয়েছিলেন। মিনিস্ট্রি অফ রিলিফ এন্ড রিহাভিলেটেশন, মিনিস্ট্রি অফ ফরেন অ্যাফেয়ার্স, মিনিস্টি অফ হোম অ্যাফেয়ার্স, এপিএস টু মিনিস্টার অফ হোম অ্যাফেয়ার্স হিসেবে চাকরী করেন, পরে তিনি চাকরী ছেড়ে দেন। এরপর বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
কফি হাউসের আড্ডা টা থাকে না, কফির কাপ বা চেয়ার কিছুই খালি থাকে না, শুধু তার কাছের ক’জনের জীবনজুড়ে শুন্যতা রয়ে গেছে। স্নেহছায়াশুন্য হয়ে রয়ে গেছি। একজন বেবী সিদ্দিকীর ছায়া নেই , মায়া আছে মন জুড়ে। তাঁকে কেন আগে যেতে হল ? বারবার মনে হয়, অভিমান হয়, আরো শুন্যতা অনুভব করি। মানবিক ভালোবাসা, মানুষের জন্য কিছু করতে ধনী হওয়া প্রয়োজন নাই , আর ইচ্ছা থাকলে মানুষের পাশে কতভাবে দাঁড়ানো যায়, তিনিই দেখিয়ে দিয়েছেন। শীতে কাঁপতে থাকা মানুষকে অনায়াসে নিজের গায়ে জড়ানো শাল খুলে দিয়েছেন, ছোট থেকেই দরিদ্র ভিক্ষুক ডেকে বাসায় এনে ভাত খাওয়াতেন। এই মানুষটির আদর স্নেহ যে পেয়েছে, সম্পদ সেটুকু। হারানো দিনের সেই মিষ্টি পিছুডাক বলতে যা আছে , ঐ টুকুই।
বিশ্বাস করতেন নিজের যা আছে তা্ই নিয়ে খুশী হতে পারা, অন্যকেও উৎসাহ দেয়া, সাহস দেয়া। ছোট ছোট বিষয়ে আনন্দিত হতে পারা, নিজের সবটুকু নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, যা আছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা, সুখী হওয়ার এই সহজ উপায়গুলোই তাঁর রোজকার অভ্যাস ছিলো। চায়ের দোকানী বা রাষ্ট্রীয় বড় পদে থাকা মানুষটি,তার ব্যবহার ছিলো সমান।
ধর্ম, বর্ণ, আর্থ সামাজিক অবস্থান, সব ছাপিয়ে সবার সাথে সমান ব্যবহার করতেন। আর তাই সবার মনেই তিনি আছেন সমান ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায়। মাগুরাবাসী আজও তাকে স্মরণ করে আন্তরিক শ্রদ্ধায়।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)