আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস। জ্ঞান ও মূল্যবোধের আলো ছড়ানো মানুষ গড়ার কারিগরদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানানোর দিন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গণে এমন একজন ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যিনি তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবন শুরু করেছিলেন শিক্ষকতা পেশায়-শ্রেণিকক্ষে।
তিনি দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। যিনি রাজনীতির উত্তাল সমুদ্রে থেকেও নিজ এলাকার মানুষের কাছে আজও তাদের প্রিয় ‘স্যার’।
শ্রেণিকক্ষ থেকে রাজনৈতিক মঞ্চে মির্জা ফখরুল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেওয়ার পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৭২ সালে বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডারের মাধ্যমে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। ঢাকা কলেজ, দিনাজপুর সরকারি কলেজ এবং সবশেষে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে তিনি অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে পাঠদান করেছেন। শিক্ষক হিসেবে তাঁর সুনাম ছিল কিংবদন্তিতুল্য। তিনি কেবল পাঠ্যবইয়ের নীরস তত্ত্বেই ছাত্রদের সীমাবদ্ধ রাখেননি, ছড়িয়ে দিয়েছেন দেশপ্রেম ও সামাজিক মূল্যবোধের আলো।
তবে শিক্ষকতার আগে থেকেই রাজনীতির সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব। ষাটের দশকে ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় কর্মী হিসেবে তিনি ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
মূলধারার রাজনীতিতে তাঁর সক্রিয় প্রবেশ ঘটে শিক্ষকতা ছাড়ার পর। ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরশাদের পতনের পর তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দিয়ে দলের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে উঠে আসেন।
তিনি কৃষি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
রাজনীতিতে তাঁর শিক্ষক সত্তার ছাপ
মির্জা ফখরুলের দীর্ঘদিনের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে করেছে সমৃদ্ধ ও ব্যতিক্রমী। তাঁর পরিশীলিত যুক্তিবোধ, মার্জিত বক্তব্য এবং ধৈর্যশীল মানসিকতা তাঁর শিক্ষক সত্তারই প্রতিচ্ছবি।
একজন শিক্ষকের মতোই তিনি মানুষের সমস্যাগুলো গভীরভাবে অনুধাবন এবং সমাধানের চেষ্টা করেন।
তাঁর স্কুলজীবনের বন্ধু এবং ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের সাবেক সহকর্মী অধ্যাপক মনতোষ কুমার দে স্মৃতিচারণা করে বলেন, ফখরুল দিনাজপুর থেকে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে সম্ভবত ১৯৮০ সালের দিকে বদলি হয়ে আসে। তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও ছাত্রবান্ধব একজন শিক্ষক ছিলেন। ছাত্ররা তার ক্লাস খুবই মনোযোগ দিয়ে করত। শিক্ষক হিসেবে তিনি যেমন সার্থক, রাজনীতিতেও তেমনই সফল।
ছাত্রদের চোখে ‘অনুকরণীয় আদর্শ’
শিক্ষকতা জীবনে তিনি যে ছাত্রদের মনে কতটা গভীর ছাপ ফেলেছিলেন, তা আজও স্পষ্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী এবং মির্জা ফখরুলের ছাত্র জয়নাল আবেদীন বলেন, “তিনি আমাদের কাছে শুধু শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও অনুকরণীয় আদর্শ। শিক্ষকতা থেকেই তাঁর রাজনীতির পথচলা, আর ছাত্ররাই ছিল তাঁর মূল শক্তি ও অনুপ্রেরণা। এ কারণেই ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ আজও তাঁকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করে।”
আরেক ছাত্র ও পীরগঞ্জ উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান জিয়াউল হাসান বলেন, আমার অর্থনীতি বিভাগের সেই গুণী শিক্ষক শুধু জ্ঞানই দেননি। আমার চিন্তার দিগন্তকে প্রসারিত করেছিলেন।
সালন্দর ডিগ্রী কলেজের শরীরচর্চা শিক্ষক আফজাল হোসেন জানান, মির্জা ফখরুল আমার স্যার ছিলেন। স্যারের খেলার মাঠে বিচরণ ছিল প্রশংসা যোগ্য। ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমানও তাঁর শিক্ষকতা জীবনের কথা উল্লেখ করেন।
সমির উদ্দিন স্মৃতি মহাবিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যক্ষ মোহাম্মদ বেলাল হোসেন বলেন, শিক্ষক দিবসে মির্জা ফখরুলের মতো ব্যক্তিত্বের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষকের ভূমিকা কেবল শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁরা সমাজ ও রাষ্ট্রকে নেতৃত্ব দেওয়ারও সক্ষমতা রাখেন।
দিনশেষে, রাজনীতির শত ব্যস্ততা ও বিতর্কের মাঝেও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ‘স্যার’ পরিচয়টিই যেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়ে টিকে আছে।


